সোহেল খান দূর্জয়- নেত্রকোনা :
এখন নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে কোনো মৌসুমেও দেখা মিলছে না কোনো অতিথি পাখির। প্রতি বছর শীতের শুরুতে নেত্রকোনা জেলার হাওর উপজেলা মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, মদন ও আটপাড়ার হাওরগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখিরা আসতে শুরু করতো কিন্তু এখন কোনো মৌসুমেও অতিথি পাখির দেখা মিলছে না। এক সময় নানা প্রজাতির অতিথি পাখির আগমনে মুখরিত হয়ে উঠতো এসব উপজেলার হাওর-বিলগুলো। অতিথি পাখিরা হাওরাঞ্চলের সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি করতো, তেমনি তারা ভূমিকা রাখতো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও। কিন্তু গত বেশ কয়েক বছর যাবত কোনো মৌসুমেও আর দেখা মিলছে না এসব অতিথি পাখির। নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্য সংকট, নির্বিচারে পাখি নিধন, হাওরাঞ্চলের জীববৈচিত্র বিনষ্ট হওয়াসহ নানাবিধ বিষয়কে অতিথি পাখি না আসার কারণ বলছেন স্থানীয় সচেতন লোকজন ও পাখিপ্রেমীরা।হাওরাঞ্চলের স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে, অতিথি পাখিদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙাপোতা হাওর, খালিয়াজুরী উপজেলার ছায়ার হাওর এবং মদন উপজেলার তলার হাওরসহ আরও বেশকিছু হাওর-বিল। এসব এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির বালি হাঁস, ল্যান্জা হাঁস, চখাচখি, পানকৌড়ি, ডাহুক, সরালী ও কাইম পাখিসহ অন্তত অর্ধশতাধিক প্রজাতির অতিথি পাখি আসতো। খাবারের সন্ধানে সুদূর সাইবেরিয়াসহ শীত প্রধান বিভিন্ন দেশ থেকে উড়ে আসতো এসব পাখি।
তবে সুযোগ সন্ধানী এক শ্রেণির অসাধু পাখি ব্যবসায়ী ও শিকারি ফাঁদ পেতে নির্বিচারে অতিথি পাখি শিকারে মেতে উঠতো। শুধু তাই নয়, কোথাও কোথাও বসতো এসব পাখি বিক্রির হাটও। আইনগত ভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও জনসচেতনতার অভাব এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে অবৈধ ভাবে অতিথি পাখি শিকার ও বিক্রি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় গত কয়েক বছর ধরে অতিথি পাখিরা আর আসে না। তবে মাঝে মধ্যে হাওর এলাকার কোনো কোনো জায়গায় গুটিকয়েক অতিথি পাখি চোখে পড়লেও শিকারিদের অত্যাচারে তারা অন্যত্র চলে যায়। হাওর এলাকা মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙাপোতা হাওরপাড়ের তেতুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মজিবুর রহমান বলেন, আগে শুধু শীত নয় সকল মৌসুমেই অতিথি পাখিদের বিচরণে মুখর থাকতো হাওরগুলো। দিন-রাত এসব পাখির কিচিরমিচির শুনতাম। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আর অতিথি পাখিরা আসে না। কারণ হাওরের প্রায় সব জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। জলাশয় গুলো ফসলের মাঠে পরিণত হয়েছে। এসব জায়গায় মানুষের বিচরণ বেড়ে গেছে। এসব কারণেই মূলত অতিথি পাখিদের নিরাপদ হাওরাঞ্চল অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
জেলার মদন উপজেলার ধোবাউলা গ্রামের মোহন ভূঁইয়া বলেন, আমাদের উপজেলার তলার হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে প্রচুর পরিমাণে অতিথি পাখিরা আসতো। দিনে এসব পাখি হাওর জলাশয়ে অবস্থান করতো এবং সন্ধ্যা হতেই তারা আশ্রয় নিতো গ্রামের বাড়ির বিভিন্ন জঙ্গল ও গাছগাছালিতে। কিন্তু বর্তমানে অতিথি পাখিরা না আসায় সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না। তিনি আরও বলেন, অতিথি পাখি আসেই না। বর্তমানে দেশীয় প্রজাতির পাখিও কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে বক ও ঘুঘুসহ দেশীয় পাখিগুলোকেও অসাধু শিকারিরা মেরে ফেলছে। এটা খুবই দুঃখজনক। একই উপজেলার সদরের বাসিন্দা পাখিপ্রেমী ও সংস্কৃতিকর্মী শফিকুল ইসলাম বলেন, এক সময় আমাদের লক্ষাীপাশা হাওর, পাঙ্গাশিয়া হাওর, সাতবিলা হাওর ও কুটিচাপরা হাওরসহ প্রায় সবকটি হাওরেই অতিথি পাখিরা আসতো। তখন হাওর ছিল পাখিদের অভয়াশ্রম। কিন্তু সেই হাওর এখন আর নাই।
হাওরের কোনো জমিই এখন আর পতিত থাকে না। তাই দেখা মিলে না এসব পাখির। জেলার প্রত্যন্ত হাওর এলাকা খালিয়াজুরী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুর রউফ স্বাধীন বলেন, এক সময় এই উপজেলার হাওরগুলোতে প্রচুর পরিমাণে অতিথি পাখিরা আসতো। এখন আর আসে না। তবে যদি কেউ পাখি শিকার করে বা বন্য পাখির ক্ষতিসাধন করে তাহলে আমরা বিষয়টি জানার সাথে সাথেই উপজেলা প্রশাসনকে দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, অতিথি পাখিসহ দেশীয় যেকোনো পাখি শিকার করা আইনগত ভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ। অতিথি পাখিসহ সব ধরনের বন্যপ্রাণি রক্ষায় প্রশাসন সর্বদা তৎপর রয়েছে। তবে বন্য পাখিদের নিরাপত্তা বিধানে আমাদের সকলকে আরও সচেতন হতে হবে এবং এগিয়ে আসতে হবে।