নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজধানীর মুগদা এলাকায় পরিবহন খাতে এক ভয়াবহ অরাজকতার চিত্র ফুটে উঠেছে। একদিকে কুখ্যাত সন্ত্রাসী বাহিনীর অস্ত্রের মুখে লক্ষ লক্ষ টাকা লুট, অন্যদিকে খোদ থানা পুলিশের পক্ষ থেকে অপরাধীদের রক্ষার প্রকাশ্য চেষ্টা—সব মিলিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন পরিবহন ব্যবসায়ীরা। এমনকি সেনাবাহিনীর অভিযানে সন্ত্রাসী ধরা পড়লেও রহস্যজনক কারণে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন মুগদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত প্রায় এক বছর আগে। 'হিমাচল এক্সপ্রেস লিমিটেড'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আসাদুজ্জামান নোমানের সঙ্গে জাবেদ নামক এক ব্যক্তির কোম্পানির শেয়ার লেনদেন নিয়ে এক কোটি টাকার চুক্তি হয়। অভিযোগ রয়েছে, জাবেদ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে এককালীন অর্থের বদলে এক বছরে ভেঙে ভেঙে মাত্র ২১ লক্ষ টাকা প্রদান করেন। এতে কোম্পানিটি প্রায় ৬০-৭০ লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
পরবর্তীতে জাবেদ ব্যবসা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে লভ্যাংশ ছাড়াই তার মূলধন ফেরত চান। এমডি আসাদুজ্জামান নোমান অর্থ ফেরতের জন্য ছয় মাস সময় চাইলে জাবেদ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং টাকা আদায়ের জন্য কুখ্যাত সন্ত্রাসী ‘শুটার বাপ্পি’কে ভাড়া করেন।
গত কয়েকদিন আগে মানিকনগর বিশ্বরোডে হিমাচল এক্সপ্রেসের অফিসে শুটার বাপ্পি তার বাহিনী নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, বাপ্পি সরাসরি আসাদুজ্জামান নোমানের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে নগদ ১১ লক্ষ টাকা ছিনিয়ে নেয়। যাওয়ার সময় আরও ৩০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং কোম্পানির অর্ধেক মালিকানা লিখে না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এই ঘটনার আকস্মিকতায় নোমান হৃদরোগে (স্ট্রোক) আক্রান্ত হন। বর্তমানে তিনি রাজধানীর বিজয়নগর ইসলামীয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বাঁচতে কোম্পানির কর্মকর্তারা মুগদা থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো উপহাস করে পুলিশ বলে— “আমরা তো কোনো চাঁদাবাজ দেখি না, আপনারা কোথায় পান?”
নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগীরা সেনাবাহিনীর দ্বারস্থ হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মানিকনগর টিটিপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে শুটার বাপ্পির দুই ক্যাডারকে আটক করে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী আটককৃতদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য ভুক্তভোগীদের থানায় পাঠালে শুরু হয় ওসি ইমদাদুল ইসলাম তৈয়বের নতুন নাটক।
মামলা না নিয়ে তিনি তদন্তের দায়িত্ব দেন এসআই আল-আমিনকে। সরেজমিনে তদন্ত করে এসআই আল-আমিন ঘটনার সত্যতা পেলেও ওসি মামলা নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান এবং ভুক্তভোগীদের কোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
অভিযোগ উঠেছে, ওসি ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব ভুক্তভোগীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বলেন— “জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে যুদ্ধ করা যায় না, আপনারা বাপ্পির সঙ্গেই মিলে যান। আমার থানায় আসেন, আমি বাপ্পিকে ডেকে আপনাদের সঙ্গে সমঝোতা করিয়ে দেব।”
ওসির এমন মন্তব্যে ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর যেখানে জনবান্ধব পুলিশিং হওয়ার কথা ছিল, সেখানে মুগদা থানায় এই ‘ফ্যাসিস্ট’ আচরণ কেন? ভুক্তভোগীদের মতে, স্বৈরাচার দেশ ছাড়লেও তার দোসররা এখনো প্রশাসনে থেকে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে।
বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, মুগদা বিশ্বরোড টিটিপাড়া থেকে গোলাপবাগ মাঠ পর্যন্ত প্রায় ২৫-৩০টি পরিবহন কাউন্টার রয়েছে। প্রতিটি কাউন্টার থেকে মাসিক ভিত্তিতে থানায় নির্দিষ্ট অংকের টাকা (মাসোহারা) যায়। কোনো মালিক পক্ষ এই টাকা দিতে দেরি করলে পুলিশ তাদের সুরক্ষা না দিয়ে বরং সন্ত্রাসীদের মদদ দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমানে শুটার বাপ্পি ও তার বাহিনী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় হিমাচল এক্সপ্রেসের স্টাফরা কাউন্টারে আসতে ভয় পাচ্ছেন।
আসাদুজ্জামান নোমানের পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। এই বিষয়ে আইজিপি এবং ডিএমপি কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা। (চলবে...)
ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ১ম পর্ব।