
আব্দুস সালাম,নীলফামারী প্রতিনিধিঃ
নীলফামারীর চিলাহাটি থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত রেলপথজুড়ে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলো ক্রমেই বড় ধরনের জননিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব ক্রসিং পারাপার করছে, যার ফলশ্রুতিতে প্রতি বছরই বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা।
রেলওয়ে ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, ডোমার উপজেলার চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন থেকে সৈয়দপুর স্টেশন পর্যন্ত প্রায় ৬২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে অনুমোদিত লেভেল ক্রসিং রয়েছে ৩৬টি। এর মধ্যে মাত্র ১৩টিতে গেটম্যান থাকলেও বাকিগুলো কার্যত অরক্ষিত। দীর্ঘদিন ধরে এসব ক্রসিংয়ে স্থায়ী রেলগেট, স্বয়ংক্রিয় সংকেত বা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
প্রতিদিন এই রেলপথের ক্রসিংগুলো দিয়ে সাইকেল, রিকশা, অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত যান, সিএনজি, ট্রাক্টর, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও মিনিবাসসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ চলাচল করে। কিন্তু ট্রেন আসার আগাম সতর্ক সংকেত না থাকায় সামান্য অসতর্কতাই অনেক সময় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে রাত ও কুয়াশাচ্ছন্ন সময়ে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
সৈয়দপুর রেলওয়ে থানার (জিআরপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নীলফামারী জেলার বিভিন্ন স্থানে ট্রেনে কাটা পড়ে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৩টি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করা হয়। এর আগে ২০২৩ সালে একই রেলপথে প্রাণ হারান ২৪ জন। স্থানীয়দের হিসাবে, গত তিন বছরে চিলাহাটি–সৈয়দপুর রেলপথে অন্তত ৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যদিও অনেক দুর্ঘটনা থানায় নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
অতীতে ঘটে যাওয়া কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এখনো এলাকাবাসীর মনে গভীর দাগ কেটে আছে। ২০২১ সালে নীলফামারী সদর উপজেলার মনশাপাড়া এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে একই পরিবারের তিন ভাইবোনসহ চারজনের মৃত্যু হয়। আবার ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দাড়োয়ানী এলাকায় একটি অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেন ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে চারজন ইপিজেডকর্মী নিহত হন। এসব ঘটনার পর ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়লেও কার্যকর সমাধান আজও অধরা।
চিলাহাটি এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, রেলক্রসিংগুলোতে নেই গেটম্যান, নেই রেলগেট বা কার্যকর সিগন্যাল। শুধু কয়েকটি সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বসিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে কর্তৃপক্ষ। মানুষের জীবন যেন এখানে মূল্যহীন।
সৈয়দপুরের এক অটোরিকশাচালক জানান, বিশেষ করে রাতে ট্রেন আসার কোনো আগাম আভাস পাওয়া যায় না। একটু ভুল হলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনবহুল এলাকা, হাট-বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে অনেক লেভেল ক্রসিংয়ে রাস্তা বাঁকানো হওয়ায় দূর থেকে ট্রেন দেখা যায় না। শীতকালে কুয়াশা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। কোথাও কোথাও স্থানীয় উদ্যোগে বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী প্রতিবন্ধক তৈরি করা হলেও তা দুর্ঘটনা ঠেকাতে যথেষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গেটম্যান নিয়োগ, স্বয়ংক্রিয় রেলগেট, আলো ও আধুনিক সতর্ক সংকেত ব্যবস্থা চালু না করলে এসব অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না।
এ বিষয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ের এক কর্মকর্তা জানান, জনবল ও বাজেট সংকটের কারণে সব ক্রসিংয়ে গেটম্যান দেওয়া যাচ্ছে না। তবে দুর্ঘটনা প্রবণ স্থানগুলোর তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদ উন নবী বলেন, ২০২৫ সালে ট্রেনে কাটা পড়ে মোট ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রতিটি ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিলে এই রেলপথে মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হবে।