
সোহেল খান দূর্জয়-নেত্রকোনা :
নেত্রকোনায় অনলাইন ফাঁদে নিঃস্ব তরুণরা, ঘরে বসে সহজে আয়। প্রতিদিন কয়েকটি ভিডিও দেখলেই মিলবে টাকা।এরকম বিজ্ঞাপনে ছয়লাভ নেত্রকোনা। মাত্র এক হাজার, দুই হাজার কিংবা তিন হাজার টাকা বিনিয়োগ করলেই শুরু হবে নিয়মিত আয়। বিনিয়োগের টাকা ও মুনাফার অংশও তোলা যাবে সহজে—এমন প্রলোভনে অনলাইনভিত্তিক স্টারলিংক নামের একটি অ্যাপে যুক্ত হন নেত্রকোনার সদর উপজেলার রৌহা ইউনিয়নের কুমড়ি ও আশপাশের এলাকার কয়েক শ তরুইং শুরুতে অনেকে টাকা তুলতে পারায় অ্যাপটির প্রতি বিশ্বাস তৈরি হয়। সেই বিশ্বাসে নিজেরা বিনিয়োগের পাশাপাশি বন্ধু, স্বজন ও পরিচিতদেরও যুক্ত করেন।কয়েক দিন পরই বদলে যায় পরিস্থিতি। টাকা উত্তোলনের আবেদন কখনো হোল্ড, কখনো রিজেক্ট দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে টাকা তুলতে হলে নির্দিষ্টসংখ্যক নতুন সদস্য যুক্ত করার শর্ত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। নতুন কেউ টাকা বিনিয়োগ করলে আগের সদস্য কমিশন পাবেন—এমন প্রলোভনে আবারও অনেকে সদস্য সংগ্রহ করেন। এভাবে দ্রুত বিস্তৃত হয় নেটওয়ার্ক।ভুক্তভোগীদের দাবি, কুমড়ি ও আশপাশের এলাকায় কয়েক শ তরুণ অ্যাপটিতে যুক্ত হয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের হিসাবে, শুধু কুমড়িতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ টাকা। অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও পরিচিতজনদের মাধ্যমে অ্যাপটির প্রচারণা চালানো হয়। এক হাজার, দুই হাজার ও তিন হাজার টাকার প্যাকেজে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক ভিডিও দেখলেই আয় হবে বলে প্রচার করা হতো।
শুরুতে দ্রুত টাকা তুলতে পারায় অনেকে আরো বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেন এবং পরিচিতদেরও যুক্ত করেন। কুমড়ির ভুক্তভোগী সাদিক (ছদ্মনাম) বলেন, এলাকার কয়েকটি ব্যক্তিগত অনলাইন গ্রুপে স্টারলিংক অ্যাপের প্রচারণা চালানো হয়। সেখানে বলা হয়, ইলন মাস্ক স্টারলিংক নামে বাংলাদেশে নতুন একটি অ্যাপ চালু করছেন। এক হাজার, দুই হাজার ও তিন হাজার টাকার প্যাকেজে বিনিয়োগ করে প্রতিদিন দুটি ভিডিও দেখলে টাকা পাওয়া যাবে। সাদিক বলেন, শুরুতে ৫০০ টাকা পর্যন্ত সহজেই উত্তোলন করা যেত। টাকা পাওয়ায় বিশ্বাস তৈরি হলে তিনি বন্ধু ও পরিচিতদের যুক্ত করেন। তাঁরাও প্রথম দিকে টাকা পান। অ্যাপটিতে টাকা জমা ও উত্তোলনে বিকাশ, নগদ ও রকেটের পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হতো। সব মিলিয়ে তিনি ও তাঁর পরিচিতজনরা প্রায় এক লাখ টাকা হারিয়েছেন বলে দাবি করেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নতুন সদস্য যুক্ত করার শর্তটিই ছিল অ্যাপটির কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুরুতে যুক্ত হওয়া কেউ কেউ বিনিয়োগের টাকা ও কিছু মুনাফা তুলতে পেরেছেন। এতে তাঁরা নিজেরাই অন্যদের যুক্ত করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যুক্ত হওয়া অনেকেই আর টাকা তুলতে পারেননি। ফলে প্রথম দিকের কিছু সদস্য লাভবান হলেও পরের দিকে যুক্ত হওয়া সদস্যদের বড় একটি অংশ বিনিয়োগের টাকা হারিয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্টারলিংক নাম ব্যবহার করে একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কার্যক্রম চালানো হতো। প্রতিবেদকের হাতে আসা দুটি গ্রুপের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর একটি গ্রুপে ২৪২ জন সদস্য ছিলেন। অন্য একটি গ্রুপের অ্যাডমিন হিসেবে ০১৬১৫৮০৭২৪৯ নম্বর পাওয়া যায়। ওই নম্বরে পিকে খান নাম দেখা গেলেও ব্যবহারকারী হোয়াটসঅ্যাপে প্রতিবেদককে নিজের নাম আকাশ তালুকদার ও বাড়ি নেত্রকোনার মদন উপজেলায় বলে জানান। আকাশ তালুকদার বলেন, জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য তিনি গ্রুপটি খুলেছিলেন। অ্যাপটি তিনি সরাসরি পরিচালনা করতেন না। তিনিও অনলাইন স্ক্যামে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা হারিয়েছেন বলে দাবি করেন। তাঁর মাধ্যমে মদন উপজেলার আরো পাঁচ-ছয়জন এতে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিজিবি ও আনসার সদস্য এবং কয়েকজন বেকার তরুণও ছিলেন বলে তিনি জানান। থানায় অভিযোগ করলে সামাজিকভাবে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার আশঙ্কায় তিনি অভিযোগ করেননি বলেও জানান।
অন্য ২৪২ সদস্যের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের অ্যাডমিন হিসেবে থাকা নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ব্যবহারকারী নিজেকে হাজেরা আক্তার পরিচয় দেন। তিনি জানান, মদনের আজিজুল নামের একজনের মাধ্যমে তিনি গ্রুপে যুক্ত হয়েছিলেন। অনলাইন লেনদেন সম্পর্কে তিনি তেমন জানেন না এবং গ্রুপে কোনো লেনদেনও করেননি। কিভাবে তিনি গ্রুপটির অ্যাডমিন হলেন, সে বিষয়েও তিনি অবগত নন বলে দাবি করেন। ভুক্তভোগীদের দেওয়া লেনদেনের তথ্য অনুযায়ী, ০১৭৮৭৫৯৮০২৯ নম্বরের একটি বিকাশ হিসাবে টাকা পাঠানোর স্ক্রিনশট হাতে আসে প্রতিবেদকের। প্রতিবেদক ওই নম্বরে একাধিকবার কল করলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। আটপাড়া উপজেলার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মো. আশরাফুল হক বলেন, অনলাইন স্ক্যামচক্রগুলো লোভনীয় অফার ও সহজে আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করে। শুরুতে নানা সুবিধার আশ্বাস দিলেও এক পর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নেয়। এটি প্রতারণামূলক কার্যক্রম। কেউ প্রতারণার শিকার হলে সরকারের সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স সিস্টেমে অনলাইনে অভিযোগ করতে পারেন। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, কেউ এ ধরনের প্রতারণার শিকার হলে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি বা লিখিত অভিযোগ দিতে পারেন।
২৯/০৮/২০২৬ ইং