
সোহেল খান দূর্জয়-নেত্রকোনা :
দখলে-দূষণের বিষে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে নেত্রকোনার মগড়া নদী। জেলা শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীতে ময়লা-আবর্জনা ও কচুরিপানায় ভরে গেছে। দেখলে মনে হবে নদী নয়—যেন ময়লার ভাগাড়। নদীর প্রাণ ফেরাতে নেই খনন ও যথাযথ উদ্যোগ। এমন পরিস্থিতিতে পানি প্রবাহ প্রায় বন্ধ। এতে নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী মগড়া নদী। খাল-বিল ও হাওরবেষ্টিত নেত্রকোনার একটি অন্যতম নদীর নাম মগড়া। নদীটি নেত্রকোনা পৌরসভা এলাকা ঘিরে রয়েছে। এক সময় এ নদীর উত্তাল তরঙ্গ ভরা যৌবন ছিল। নদীর বুক চিরে চলতো পাল তোলা নৌকা। এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল জেলা শহর। প্রসার ঘটেছিল জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য ও সভ্যতা। নৌকায় লোকজন যাতায়াতসহ কৃষকের উৎপাদিত পণ্যও বিক্রির জন্য বড় মোকামে নিয়ে যেতো এই নদী পথে। দুই পাড়ের বাসিন্দাদের গোসল, গৃহস্থালির কাজ চলতো নদীর পানিতে। মগড়া আজ মৃতপ্রায়।
জেলা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। নদীর তীরে অবৈধভাবে দখল করা জায়গায় গড়ে উঠছে বাসা-বাড়িসহ নানা স্থাপনা। মোক্তারপাড়া, ছোট বাজার, নাগড়া এলাকায় বাসা-বাড়ির পয়ঃনিষ্কাশনের শতাধিক পাইপ নদীতে দেওয়া। ময়লা আর কচুরিপনায় ভরা নদী। মালনী ইসলামপুর এলাকায় নদীর তলায় জমে থাকা পানি ময়লা-আবর্জনায় নীল হয়ে গেছে। দূষণ আর দখলের কারণে নদীর অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে।সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘ দিন ধরে উজান থেকে আসা পলি জমে আর স্থানীয় দখলদারদের কারণে নদীটিতে নাব্যতা সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি থাকে না। পানি না থাকায় বিপাকে পড়েন স্থানীয় কৃষকরা। বর্তমানে নদীতে জোয়ার-ভাটা নেই। ভরা বর্ষায় পানি থাকলেও ময়লা আবর্জনা এবং অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা ব্রিজের কারণে নৌকা- ট্রলারও চলাচল করতে পারে না।
এদিকে, নদীর দুই পাড়ে দখলের মহোৎসব চলছে। দখলদাররা নদীর বিভিন্ন স্থানে গতিপথ বন্ধ করে শত শত অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছেন।প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলে দিনদিন নদী ছোট হয়ে আসছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পানির প্রবাহ। ফলে বেশ কয়েক বছর ধরে এই নদী কারও কল্যাণে আসছে না। দখলে-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে পড়া মগড়া নদী দখল মুক্ত ও খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নেত্রকোনা পৌরবাসী জানান, আগে এই নদীতে প্রচুর মাছ ছিল। নৌকা-ট্রলার নির্বিঘ্নে চলাচল করত। এখন এই নদী খনন না করায় ও দখলের কারণে মরার পথে। শহরের সাতপাই কালিবাড়ী মোড় এলাকার বাসিন্দা সংকর সরকার বলেন, ‘অনেক বাসা-বাড়ির পায়খানার পাইপ লাগানো এই মগড়া নদীতে। কাছে যেতেই দুর্গগ্ধে বমি আসে। ছোট বাজারের ব্যবসায়ী মনোরঞ্জন সরকার জানান, ‘আর কোনো উপায় না থাকায় আমরা মগড়া নদীর পানি ব্যবহার করি। গোসলের পর শরীর চুলকায়। এই পানি ব্যবহারে পোলাপানের অসুখ-বিসুখও ছাড়ে না।
দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে জেলার গুরুত্বপূর্ণ এই নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মগড়া নদী নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সর্পিলাকার নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১২ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ প্রায় ৭৭ মিটার। একসময় এটি নেত্রকোনার প্রধান জলপথ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে নাব্যতা সংকট, অবৈধ দখল ও দূষণের কারণে নদীটি অনেক জায়গায় ছোট নালায় পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিকভাবে ধলাই নদী নামে প্রবাহিত হয়ে পূর্বধলা উপজেলার হোগলা বাজারের পাশ দিয়ে পূর্বধলা সদর অতিক্রম করে ত্রিমোহনীতে এসে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়। সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন অংশে গিয়ে দেখা যায়, নদীর বহু জায়গায় পলি জমে প্রস্থ কমে গেছে।
কোথাও বড় চর জেগে উঠেছে, কোথাও আবার সামান্য হাঁটু পানি টিকে আছে। নদীর বুকের ভেতরেই বিভিন্ন স্থানে কৃষিকাজ শুরু হয়েছে।আটপাড়ার বানিয়াজান গ্রামের কৃষক একলাছ মিয়া বলেন, আগে নদী থেকে সেচের পানি পাওয়া যেত। এখন নদীতে পানি নেই বললেই চলে। ফলে কৃষিকাজও কঠিন হয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন নদী খনন না হওয়া, নদীর তীর ও বুক দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং শহরের বর্জ্য ফেলার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে নদীটি মৃতপ্রায় হয়ে পড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পুনঃখননসহ বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। এরই মধ্যে মগড়া নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি অংশ পুনঃখননের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।