সোহেল খান দূর্জয়-নেত্রকোনা : নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে অন্যের জমির ভুয়া নামজারি (খারিজ) কপি ও ডিসিআর রসিদ নিয়ে ভূমি উন্নয়ন কর দিয়ে খতিয়ান খোলার চেষ্টা করার অভিযোগে শিপন মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। পরে তাঁকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ভুয়া কাগজপত্র জব্দ করেছে ভূমি অফিস। সোমবার সকালে উপজেলার বড়তলী-বানিয়াহারী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এ ঘটনা ঘটে। শিপন মিয়া উপজেলার বড়তলী-বানিয়াহারী ইউনিয়নের খুচিরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর সঙ্গে থাকা খারিজ ও ডিসিআর কাগজপত্র যাচাই করে ভুয়া বলে শনাক্ত করা হয়। ওই কাগজপত্রে একই এলাকার নূর মিয়া নামের এক ব্যক্তির ১০ শতাংশ জমির তথ্য ছিল। এ ঘটনায় ভুয়া খারিজ তৈরির মুল হোতাকে খুঁজে বের না করেই আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ায় সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ ঘটনাকে হালকাভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন ইউএনও ও ওসি। দীর্ঘ সময় তাঁরা এসব কাগজপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তিকে আটক করলেও প্রকৃত খারিজে কার নামে সেটিই মনে করতে পারেননি।ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, শিপন মিয়া ওই খারিজ ও ডিসিআর নিয়ে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে খতিয়ান খোলার জন্য আসেন। অনলাইনে কাগজপত্র যাচাই করার পর সেগুলো ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। এরপর তাঁকে আটক করা হয় এবং ভুয়া খারিজ ও ডিসিআর জব্দ করা হয়। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুন ভূমি অফিসে যান এবং শিপন মিয়াকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। পরে থানায় মুচলেকা নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। খারিজে উল্লেখিত জমির প্রকৃত মালিককে নিয়ে আসার জন্য তাঁকে বলা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজ মিয়া বলেন, মাস-দেড়েক আগে একইরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল, তখন তথ্য সূত্র ধরে মূল হোতাকে আটক করে সাজা দেওয়া হয়েছিল। এবারও মূল হোতাকে ধরার সুযোগ ছিল। কিন্তু আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দিয়ে মূল হোতাকে আড়াল করার হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনটা হলে সরকারি নথিপত্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমবে। আর অপরাধীরাও উৎসাহিত হবে। বড়তলী-বানিয়াহারী ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা সেলিম ইউসুফ বলেন, শিপন মিয়া ভূমি উন্নয়ন কর দিয়ে খতিয়ান খোলার জন্য একটি খারিজ ও ডিসিআর নিয়ে এসেছিলেন। অনলাইনে যাচাই করে সেটি ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে আটক করা হয়। খারিজটি শিপন মিয়ার নামে নয়, নূর মিয়া নামের একজনের নামে। তাঁর কাছ থেকে ভুয়া কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে। মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুল ইসলাম হারুন বলেন, ‘শিপন মিয়া অন্য একজনের খারিজ নিয়ে এসেছিলেন, সেটি সঠিক কি না যাচাই করতে। তিনি সরল-সোজা মানুষ। তাঁকে আটক করা হলেও পরে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। খারিজের প্রকৃত মালিককে নিয়ে আসতে বলা হয়েছে।’ তবে খারিজে উল্লেখিত প্রকৃত মালিকের নাম জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘এটা মনে নেই।’ ইউএনও আমেনা খাতুন বলেন, ‘খারিজটি শিপন মিয়ার নিজের নয়। সঠিক কি না, তা যাচাই করতে তিনি ভূমি অফিসে গিয়েছিলেন। তাঁকে আটক করার পর মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত মালিককে নিয়ে আসতে বলা হয়েছে।’প্রকৃত মালিকের নাম জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, ‘আসল মালিকের নাম জানি না। তাঁকে বলা হয়েছে, আসল মালিককে নিয়ে আসতে। তিনি নিয়ে আসবেন বলেছেন।’ আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, এর আগে গত ৩১ আগস্টও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। সেদিন এক ব্যক্তি অন্যের জমির ভুয়া খারিজ ও ডিসিআর নিয়ে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে খতিয়ান খোলার চেষ্টা করেন। পরে তাঁকে আটক করা হয়। এরপর খারিজে উল্লেখিত জমির মালিক মাহবুব মিয়াকে ডেকে আনা হয়। মাহবুব জানান, জমি খারিজ করে দেওয়ার জন্য তিনি উপজেলা পরিষদের সামনে থাকা কম্পিউটার দোকানি ওয়াদুদ মিয়া ওরফে বাবুকে টাকা দিয়েছিলেন। পরে বাবু তাঁকে ওই ভুয়া খারিজ ও ডিসিআর দেন। এরপর ওয়াদুদ মিয়া ওরফে বাবুকে আটক করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কম্পিউটার দোকান থেকে ভুয়া খারিজ ও ডিসিআর তৈরির অভিযোগ থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা না করে অভিযোগের ধরন পরিবর্তন করা হয়। পরে তাঁকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ১০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এবারও ভুয়া খারিজ ও ডিসিআর নিয়ে আসা ব্যক্তিকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ায় ঘটনার মূল উৎস ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের দাবি, শুধু কাগজ নিয়ে আসা ব্যক্তিকে ছেড়ে না দিয়ে এসব ভুয়া দলিল কোথা থেকে তৈরি হয়েছে, কারা তৈরি করেছে এবং এর পেছনে আর কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
২১/০৯/২৬
০১৩২০৫৪৮৬৫১