
মো: গোলাম কিবরিয়া
রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার চাঁইসাড়া গ্রামে এক মাছ ব্যবসায়ীকে মবের কবলে ফেলে পুলিশের উপস্থিতিতেই ফাঁকা চেক ও নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
ভুক্তভোগী মাছ ব্যবসায়ী আসাদুল ইসলামের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি মহল তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় পরিকল্পিতভাবে তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয়। পরে মব তৈরি করে পুলিশের সামনেই ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিতে বাধ্য করা হয়।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে একই গ্রামের হাসান সরদার, মাসুদ রানা ও আশরাফুল ইসলাম আসাদুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গ্রামের অপরপ্রান্তের একটি বাড়িতে আটকে রাখেন। সন্ধ্যার দিকে তাঁকে প্রকাশ্যে আনা হলে সেখানে ১২০ থেকে ১৩০ জনের একটি মব জড়ো হয়।
খবর পেয়ে রাতে হাটগাঙ্গোপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করার বদলে মবকারীদের দাবির প্রতি নরম অবস্থান নেয়।
একপর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতিতেই আসাদুল ইসলামের বাড়ি থেকে জনতা ব্যাংকের চেক বই আনা হয় এবং তিনটি ফাঁকা চেক ও তিনটি ৩০০ টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর ওই চেক ও স্ট্যাম্প মবের নেতৃত্বে থাকা হাসান সরদারের কাছে জমা দিয়ে রাত প্রায় নয়টার দিকে আসাদুল ইসলামকে বাড়িতে পৌঁছে দেয় পুলিশ।
ভুক্তভোগী আসাদুল ইসলাম বলেন, আমার কাছে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। আমি টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে আমাকে আটকে রেখে পুলিশের সামনেই ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিতে বাধ্য করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় কোলাবিল মাছচাষ প্রকল্পে তিনি আগে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন। প্রায় নয় মাস আগে হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে দায়িত্ব ছাড়েন। বর্তমানে সেই দায়িত্ব পালন করছেন হাসান সরদার।
অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে হাসান সরদার বলেন,
“যা হয়েছে, পুলিশের সামনেই হয়েছে। পুলিশ উপস্থিত থেকেই সব করেছে।
মবের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যক্তি দাবি করেন, আসাদুল ইসলাম মাছচাষ প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে তাঁরা শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে থানায় কোনো মামলা বা লিখিত অভিযোগ করা হয়নি বলেও স্বীকার করেন তাঁরা।
ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা হাটগাঙ্গোপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুল মান্নান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়ে ফোন কেটে দেন।
স্থানীয় নরদাশ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন,
“আমি নিজেও অবাক হয়েছি। মব তৈরি করে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, পুলিশ ব্যবসায়ীকে উদ্ধার না করে উল্টো বাড়ি থেকে চেক এনে ফাঁকা স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনায় সহযোগিতা করেছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—আইনের শাসন যেখানে থাকার কথা, সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই যদি মব বিচার ও জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায়ের ঘটনা ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপত্তা পাবে।