
মোঃ শাহজাহান বাশার
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে মহাকালের পথে যাত্রা করলেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
ফার্স্ট লেডি থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী—এক অনন্য রাজনৈতিক অভিযাত্রার নাম খালেদা জিয়া। টানা প্রায় ৪৫ বছর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণতন্ত্র, প্রতিরোধ ও সংগ্রামের প্রতীক। গৃহবধূর জীবন থেকে রাজনীতির কঠিন ময়দানে এসে টানা ৯ বছর স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব, তিনবার প্রধানমন্ত্রিত্ব, দুবার বিরোধীদলীয় নেতৃত্ব এবং দেড় দশকের বেশি সময় ধরে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল ইতিহাস গড়ার এক দীর্ঘ অধ্যায়।
ক্ষণজন্মা এই নেত্রীর জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়ায়। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তাঁর পিতা ইস্কান্দর মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মাতা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী। তাঁদের আদি পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়িতে।
খালেদা জিয়া পাঁচ বছর বয়সে দিনাজপুর মিশন স্কুলে ভর্তি হন। পরে দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। একই বছর তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। বিয়ের পরই তিনি ‘খালেদা জিয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
স্বামীর কর্মসূত্রে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমান পাকিস্তান) অবস্থান করেন এবং ১৯৬৯ সালের মার্চ পর্যন্ত করাচিতে বসবাস করেন। পরে ঢাকায় ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে খালেদা জিয়া আত্মগোপনে যান। ১৬ মে নৌপথে ঢাকায় এসে বড় বোন খুরশিদ জাহানের বাসায় অবস্থান করেন। পরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হয়ে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি থাকেন। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি দুই সন্তানসহ মুক্তি পান।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জীবিত থাকাকালীন তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। বিএনপির নেতাকর্মীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।
এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ১৯৮৩ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারপারসন হন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সাতদলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয় এবং সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৯৮৭ সালে ‘এরশাদ হটাও’ একদফা আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ আট বছরের আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন—দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। তাঁর সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাংবিধানিক ভিত্তি স্থাপন।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও ব্যাপক আন্দোলনের মুখে মাত্র ১৫ দিনের মাথায় সংসদ ভেঙে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের পথ সুগম করেন তিনি।
সপ্তম জাতীয় সংসদে বিএনপি বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বিরোধীদলীয় নেত্রী।
২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন। এই মেয়াদে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, নারী শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার হয়।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা সরকার খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদ করে। পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি গৃহবন্দিত্ব, রাজনৈতিক অবরোধ, মামলা ও কারাবরণের শিকার হন। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা দিয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। লিভার সিরোসিস, হৃদযন্ত্রের জটিলতা ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। সর্বশেষ এভারকেয়ার হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
গৃহবধূ থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী—খালেদা জিয়ার জীবন ছিল সাহস, আত্মত্যাগ ও আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক। রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও তিনি আজ জাতির এক ঐতিহাসিক চরিত্র।
মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
বাংলাদেশ তাঁকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় চিরকাল স্মরণ করবে।