
চট্টগ্রাম বিশেষ প্রতিনিধি; আহমদ রেজা :
সরকারি পরীক্ষাবিষয়ক সংশোধিত আইনের কয়েকটি ধারা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত কঠোর, অস্পষ্ট ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ উল্লেখ করে তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (বাকবিশিস)। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, আইনের প্রস্তাবিত কিছু কঠোর শাস্তির বিধান শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ, শিক্ষকসমাজের পেশাগত মর্যাদা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেল ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘সরকারি পরীক্ষা (অপরাধসমূহ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে আলোচনায় শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনেরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাকবিশিস কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ তালুকদার। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর লিখিত বক্তব্যে বলেন, পরীক্ষা-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য আইনে সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পূর্ববর্তী আইনের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে শাস্তির মাত্রা পুনর্বিন্যাস করা হলেও কতিপয় বিধান ‘ডিউ প্রসেস অব ল’ এবং পেশাগত মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন, সংশোধিত আইনে প্রস্তাবিত কঠোর শাস্তির বিধান শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জীবন, পেশাগত মর্যাদা এবং শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ধারা ৩(ক)-এ ‘আইনগত কর্তৃপক্ষ’-এর সংজ্ঞা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট। ভুলবশত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশ করলে কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের বিধান যুক্তিসঙ্গত নয়। শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে পরীক্ষা বাতিল এবং শিক্ষকের ক্ষেত্রে চাকরিবিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট।
তিনি আরও বলেন, ধারা ১০(ক)-এ উত্তরপত্র মূল্যায়নে অতিরিক্ত বা কম নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অথচ উত্তরপত্র মূল্যায়ন একটি পেশাগত ও একাডেমিক বিচারপ্রক্রিয়া। এটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করলে শিক্ষকদের মধ্যে গভীর ভীতি সৃষ্টি হবে এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যান্ত্রিক ও আত্মঘাতী হয়ে পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই কারাদণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়।
বাকবিশিসের সাধারণ সম্পাদক ধারা ৩(ক), ৪, ৫, ৬, ৮, ৯(ক), ১০(ক) ও ১৪ পুনর্বিবেচনা করে শাস্তির মেয়াদ ও প্রয়োগের পরিধি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পরীক্ষা বাতিল এবং শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এ ছাড়া দুর্ঘটনাজনিত ভুল এবং প্রতারণামূলক বা জালিয়াতিমূলক মূল্যায়নের মধ্যে সুস্পষ্ট আইনগত সীমারেখা ও পার্থক্য নির্ধারণের দাবি জানানো হয়। শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, আইনবিদ ও মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে তাদের মতামতের ভিত্তিতে আইনটি চূড়ান্ত করারও আহ্বান জানানো হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক মূল্যায়নের দিকে শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিচালিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের দাবি তোলেন তারা।
বক্তারা বলেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় দেড় বছরেও শিক্ষা নিয়ে কোনো কমিশন গঠন করেনি। ফলে একটি অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক, বৈষম্যহীন, সর্বজনীন ও গণতান্ত্রিক শিক্ষা নীতি প্রণয়ন এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণের লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।
তারা আশা প্রকাশ করেন, সরকার বিষয়টি সদয়ভাবে বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে। যাতে আইনটি চূড়ান্ত হওয়ার আগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বার্থ এবং শিক্ষকসমাজের উদ্বেগ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ, গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিশিষ্ট কলামিস্ট, গবেষক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. ন হ ম আবু বকর, বিসিএস সাধারণ শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ও ঢাকা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক আই কে খন্দকার সেলিম, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বিটিএ)-এর সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মো. শামীম আল মামুন (জুয়েল), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাজু আহম্মেদ, বাকবিশিস সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার, প্রবীণ শিক্ষক নেতা আলী আহমদ, উন্নয়নকর্মী ও শিক্ষা গবেষক এনামূল হক, গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রতিনিধি শামসুন্নাহার কলি, বাকবিশিস নেতা অধ্যাপক মিজানুর রহমান মজুমদার ও অধ্যক্ষ আকমল হোসেন, বাংলাদেশ মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. নূরে আলম বিপ্লব এবং সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি শাহীনূর আলমসহ বিভিন্ন শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।