মিজানুর রহমান মুবিন, ঝালকাঠি প্রতিনিধি॥
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঝালকাঠি জেলা বিএনপির ঘোষিত কর্মসূচির পাশাপাশি দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগ স্বীকারকারী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নের দাবি ও প্রত্যাশা সামনে এসেছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দলে নতুন করে যুক্ত হওয়া সুবিধাবাদী ও হাইব্রিডদের দৌরাত্ম্যে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীরা অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন—এমন অভিযোগ ও হতাশা রয়েছে বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালনের লক্ষ্যে ঝালকাঠি জেলা বিএনপি দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ১ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় আমতলা সড়কে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৮টায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, সকাল ৯টা থেকে শহীদ জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার, সকাল ১০টায় জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য র্যালি এবং সকাল ১১টায় ঝালকাঠি জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আলোচনা সভা, দোয়া অনুষ্ঠান ও তবারক বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে।
দলটির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক মুক্তি ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক দর্শন সামনে রেখে দলটি দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন আন্দোলনে বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে সক্রিয় থেকেছেন। বিশেষ করে ২০০৮ সালের পর দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের বহু নেতাকর্মী আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিলেন। অনেকেই চাকরি, ব্যবসা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। কারও বিরুদ্ধে হয়েছে একাধিক মামলা, কেউ হারিয়েছেন স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ। এসব ত্যাগের মধ্য দিয়ে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ভূমিকা রেখেছেন বলে দাবি তাদের।
তবে ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের পাশে নতুন করে অনেক সুবিধাবাদী ও হাইব্রিড ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে—এমন অভিযোগ রয়েছে ঝালকাঠি বিএনপির তৃণমূলের একাংশের। তাদের অভিযোগ, যারা দুঃসময়ে রাজপথে ছিলেন না, মামলা-হামলার শিকার হননি কিংবা দলীয় কর্মসূচিতে দৃশ্যমান ছিলেন না, তাদের কেউ কেউ এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। এতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী দিনের বিএনপিতে ত্যাগ, যোগ্যতা, সাংগঠনিক ভূমিকা, মামলা-হামলার শিকার হওয়া এবং দুঃসময়ে দলের পাশে থাকার ইতিহাসকে মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড করা হবে। তাদের মতে, দুঃসময়ে যারা দলকে আগলে রেখেছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
নেতাকর্মীদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা কেবল উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের শিক্ষা ও ত্যাগের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে তৃণমূলের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ও অভিমানকে গুরুত্ব দিয়ে দলকে আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
ঝালকাঠি বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা—দুঃসময়ের ত্যাগ যেন সুসময়ে বিস্মৃত না হয়; রাজনীতিতে সুযোগসন্ধানী নয়, পরীক্ষিত ও ত্যাগীদেরই যেন যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়।