সোহেল খান দূর্জয়-নেত্রকোনা :
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় সবুজে ঘেরা নিরিবিলি এক গ্রাম। চারপাশে লতাপাতা আর আগাছার জঙ্গল। কোথাও পুরোনো দেয়াল আঁকড়ে ধরেছে শিকড়-বাকড়, কোথাও খসে পড়ছে ছাদের প্লাস্টার। সময়ের ক্ষত বুকে নিয়ে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে একটি দ্বিতল ভবন। পাশে বিশাল পুকুর,শানবাঁধানো ঘাট আর পুরোনো মন্দির। প্রকৃতি ও অবহেলার সঙ্গে যেন নীরব লড়াই করছে একটি ইতিহাস। এটি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চিরাং ইউনিয়নের সাজিউড়া গ্রামের ঐতিহাসিক নলিনীরঞ্জন সরকারের পৈতৃক বাড়ি। একসময় যে বাড়িতে ছিল সমৃদ্ধির ছাপ, মানুষের আনাগোনা ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের আবহ, আজ সেখানে নেমেছে নীরবতা। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে বাড়িটির দেয়াল ও ছাদে ধরেছে ক্ষয়। এই সাজিউড়াতেই জন্মেছিলেন নলিনীরঞ্জন সরকার, যিনি পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ভারত ও স্বাধীন ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প-বাণিজ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অবিভক্ত বাংলার অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী হন এবং ১৯৪৯ সালে স্বল্প সময়ের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। তিনি ছিলেন রাজনীতিক, শিল্পপতি, অর্থনীতিবিদ, সমাজহিতৈষী, সংগঠক ও শিক্ষানুরাগী নলিনীরঞ্জন সরকার। এদিকে সাজিউড়া থেকে কলকাতার রাজনীতি : ১৮৮২ সালে এই বাড়িতে এক মধ্যবিত্ত কায়স্থ পরিবারে নলিনীরঞ্জন সরকারের জন্ম। তার বাবা চন্দ্রনাথ সরকার ও মা প্রসন্নময়ী দেবী। গ্রামীণ পরিবেশে শৈশব কাটানোর পর পড়াশোনার জন্য তিনি ঢাকায় যান। ১৯০২ সালে ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। পরে কলকাতার সিটি কলেজে পড়াশোনা শুরু করলেও পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে তার উচ্চশিক্ষা আর সম্পন্ন হয়নি।
শিক্ষাজীবন থেমে গেলেও থেমে থাকেনি তার স্বপ্ন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন। কলকাতার শুরুটা তার জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন। অর্থকষ্টে সাধারণ মেসে থেকেছেন, কখনো কখনো অনাহারেও দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু প্রতিকূলতা তাকে দমাতে পারেনি। দেশবন্ধুর সান্নিধ্যে বদলে গেল জীবন : নলিনীরঞ্জন সরকারের মেধা, কর্মনিষ্ঠা ও সাংগঠনিক দক্ষতা নজরে আসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের। তার সহায়তায় নলিনীরঞ্জন হিন্দুস্তান কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স সোসাইটিতে কাজের সুযোগ পান। ১৯১১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত হন। সাধারণ পর্যায়ের কাজ থেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং পরবর্তীকালে এর সভাপতি হন।কর্মজীবনের পাশাপাশি রাজনীতিতেও তার পরিচিতি বাড়তে থাকে। স্বরাজ পার্টির সঙ্গে যুক্ত থাকার পর তিনি বঙ্গীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ১৯৩৬ সালে এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। ১৯৩৭ সালে গঠিত হক মন্ত্রিসভায় তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। রাজনৈতিক ও নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ালেও আবারও দায়িত্বে ফিরেছেন। অবিভক্ত বাংলার অর্থমন্ত্রী থেকে ভাইসরয়ের কাউন্সিলে : নলিনীরঞ্জন সরকারের কর্মপরিধি শুধু বঙ্গীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৪১-৪২ সালে তিনি ভারতের ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভূমির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের পাশাপাশি বাণিজ্য, শিল্প ও খাদ্য বিভাগের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৪৩ সালে মহাত্মা গান্ধীর আটক হওয়ার প্রতিবাদে তিনি ভাইসরয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন। রাজনৈতিক অবস্থান ও নীতির প্রশ্নে তার এই পদক্ষেপ ছিল দৃঢ়তার পরিচায়ক।
পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী : ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও নলিনীরঞ্জন সরকার সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরের বছর, ১৯৪৯ সালে কয়েক মাসের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। রাজনীতির বাইরে শিক্ষা ও শিল্পে অবদান : নলিনীরঞ্জন সরকার ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। শিল্প-বাণিজ্য, অর্থনীতি, শিক্ষা ও প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসারেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯২৩ সালের ইন্দো-জাপানিজ ট্রেড কনফারেন্সে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। কলকাতা বন্দরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক কমিটির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। শিক্ষাক্ষেত্রেও তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের ফেলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্টের সদস্য এবং প্রেসিডেন্সি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-চ্যান্সেলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল ফর টেকনিক্যাল এডুকেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন।আইআইটি প্রতিষ্ঠার পেছনেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা : ভারতের আধুনিক প্রযুক্তিশিক্ষার ইতিহাসেও নলিনীরঞ্জন সরকারের নাম গুরুত্বপূর্ণভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৪৫ সালে তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি, যা পরে ‘সারকার কমিটি’ নামে পরিচিত হয়, দেশে উচ্চতর প্রযুক্তিশিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুপারিশ করে। কমিটির প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চতর প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। পরবর্তী সময়ে ভারতের আইআইটি ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পেছনে এই সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
নিউ আলিপুরের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে তার নাম : নলিনীরঞ্জন সরকারের কর্মজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিন্দুস্তান কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স সোসাইটির সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্ক। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার নাম যুক্ত ছিল। কলকাতার নিউ আলিপুর এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। ফলে তার কর্মের ছাপ শুধু রাজনীতি, প্রশাসন কিংবা শিক্ষা ক্ষেত্রে নয়, কলকাতার নগর উন্নয়ন ও শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত ছিল।নিজের জন্মভূমির স্মৃতি আজ বিলীনের পথে : এত বড় এক ব্যক্তিত্বের জন্মভিটায় ফিরে এলে চোখে পড়ে একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতা। সাজিউড়া গ্রামের সেই পুরোনো বাড়িটি আজ জরাজীর্ণ। প্রায় এক একর জমির ওপর থাকা দ্বিতল ভবনের বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ক্ষয়ের চিহ্ন। স্থানীয়দের ভাষ্য, নলিনীরঞ্জন সরকারের পরিবারের রেখে যাওয়া কয়েক একর জায়গাজমি স্থানীয় সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে গ্রামের বাসিন্দারা বসবাস ও চাষাবাদ করছেন। স্থানীয় সচেতন মানুষের দাবি, নলিনীরঞ্জন সরকারের পৈতৃক বাড়ি কোনো সাধারণ পুরোনো স্থাপনা নয়। এটি একজন ঐতিহাসিক বাঙালি রাষ্ট্রনায়কের জন্মভিটা। তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাক্ষেত্রের অবদান বিবেচনায় এই বাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্বও অনেক। তাই বাড়িটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় দ্রুত সরকারি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। যথাযথভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা গেলে এটি হতে পারে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বাড়িটি সংরক্ষণের পাশাপাশি সেখানে নলিনীরঞ্জন সরকারকে নিয়ে একটি স্মৃতি জাদুঘর, গবেষণাকেন্দ্র বা ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে নতুন প্রজন্ম তার জীবন, কর্ম ও অবদান সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।
01320548651
09/09/2026