রিপোর্টার
কিশোরগঞ্জের ধুলদিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর সহশ্রাম এলাকার পশ্চিম সহশ্রাম থেকে কইতরীপাড়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দীর্ঘ প্রায় ২০ বছরেও সংস্কার বা উন্নয়নের আওতায় না আসায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় প্রায় ১০ হাজার মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে সড়কটির বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গর্ত, খানাখন্দ ও নিচু-উঁচু পথ। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে কাদায় পরিণত হয়। এতে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে তারা সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার বিষয়টি তুলে ধরলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগপথটি দিন দিন আরও বেহাল হয়ে পড়ছে।
বৃষ্টিতে সড়ক যেন কাদার সাগর
শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালি আর বর্ষায় কাদা-পানি—এভাবেই বছরের পর বছর পার করছেন পশ্চিম সহশ্রাম ও কইতরীপাড়ার মানুষ। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় সড়কের বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকে। কোথাও তৈরি হয় বড় বড় গর্ত, আবার কোথাও কাদা এতটাই পিচ্ছিল হয়ে যায় যে পায়ে হেঁটেও চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, বর্ষাকালে ভ্যান, রিকশা ও মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই বিপাকে পড়তে হয়। কোনো কোনো স্থানে কাদায় যানবাহনের চাকা আটকে যায়। এতে যাত্রীদের নেমে গিয়ে গাড়ি ঠেলে পার করতে হয়।
বিশেষ করে রাতের বেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় গর্ত ও কাদার অবস্থান বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কৃষকের ঘামে উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে বাড়তি খরচ
এলাকার অর্থনীতি অনেকটাই কৃষিনির্ভর। স্থানীয় কৃষকেরা জমিতে ধান, সবজি ও বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন। কিন্তু উৎপাদিত এসব পণ্য বাজারে নেওয়ার সময় তাদের পড়তে হয় নতুন সমস্যায়।
সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে কৃষিপণ্য পরিবহনে সময় বেশি লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়। বর্ষাকালে কাদায় গাড়ি আটকে গেলে কৃষকদের নিজেদের উদ্যোগে গাড়ি পার করতে হয়। এতে একদিকে যেমন শ্রম বাড়ে, অন্যদিকে কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে।
একজন স্থানীয় কৃষক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার একই অবস্থা। জমিতে ফসল ফলাতে যতটা কষ্ট হয়, তার চেয়ে বেশি সমস্যা হয় সেই ফসল বাজারে নিয়ে যেতে। রাস্তা ভালো থাকলে কম খরচে ও দ্রুত কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া সম্ভব হতো। তাই দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা প্রয়োজন।
স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদেরও ভোগান্তি
সড়কটির দুরবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াতেও সমস্যা হচ্ছে। বর্ষাকালে কাদা-পানির কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে পোশাক ও বই-খাতা রক্ষার জন্য বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। কোথাও কোথাও কাদা মাড়িয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়।
স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, রাস্তার অবস্থা খারাপ থাকায় সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সময় তারা উদ্বিগ্ন থাকেন। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে ছোট শিক্ষার্থীদের যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
জরুরি রোগী পরিবহনেও দুর্ভোগ
সড়কের বেহাল অবস্থার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি দেখা দেয় জরুরি রোগী পরিবহনের ক্ষেত্রে। কোনো বাসিন্দা অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যাম্বুলেন্স বা অন্যান্য যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রেও সড়কের গর্ত ও কাদা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একজন রোগীকে হাসপাতালে নিতে যেখানে স্বাভাবিক অবস্থায় অল্প সময় লাগার কথা, সড়কের বেহাল দশার কারণে সেখানে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে এই বিলম্ব রোগীর জন্য আরও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
নারী ও বয়স্কদের চলাচলেও সংকট
সড়কটির বেহাল অবস্থায় নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষের দুর্ভোগও কম নয়। কাদা-পানির মধ্যে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে যেতে চান না। বাজার, চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যাতায়াতেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একটি সড়ক শুধু যানবাহন চলাচলের পথ নয়; এর সঙ্গে একটি এলাকার মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক যোগাযোগও জড়িত। তাই এই সড়কের দীর্ঘদিনের দুরবস্থা এলাকার সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে।
দীর্ঘদিনের দাবিতে বাড়ছে ক্ষোভ
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দুই দশক ধরে সড়কটি সংস্কার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে বর্ষা আসে, রাস্তা কাদায় ডুবে যায়, মানুষ দুর্ভোগ পোহায়—আবার বর্ষা শেষে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও স্থায়ী সংস্কার আর হয় না।
স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রায় ১০ হাজার মানুষের চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক এত দীর্ঘ সময় ধরে কেন সংস্কারের বাইরে থাকবে? সড়কটির উন্নয়ন হলে শুধু পশ্চিম সহশ্রাম ও কইতরীপাড়ার মানুষ নয়, আশপাশের এলাকার বাসিন্দারাও এর সুফল পাবেন বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় নেতৃবৃন্দের দ্রুত উদ্যোগের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলার সময় উপস্থিত ছিলেন ২ নম্বর সহশ্রাম-ধুলদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া এবং ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফারজুল ইসলাম ভূঁইয়া।
তারা এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে বলেন, যোগাযোগব্যবস্থা একটি এলাকার উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকায় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে। তারা দ্রুত সড়কটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়নকাজ গ্রহণের দাবি জানান।
সড়কটি সংস্কার হলে বদলাবে এলাকার চিত্র
স্থানীয়দের মতে, পশ্চিম সহশ্রাম থেকে কইতরীপাড়া পর্যন্ত সড়কটি সংস্কার করা হলে এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কৃষকরা কম খরচে দ্রুত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে পারবেন। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হবে। অসুস্থ রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থাও আরও গতিশীল হবে।
এলাকাবাসী মনে করছেন, সড়কটির উন্নয়ন শুধু একটি রাস্তা সংস্কারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় ১০ হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষি অর্থনীতি, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা—এবার হবে স্থায়ী সমাধান
দীর্ঘ ২০ বছরের অপেক্ষার অবসান চান পশ্চিম সহশ্রাম ও কইতরীপাড়ার মানুষ। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সড়কটির বাস্তব অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে একটি কার্যকর ও টেকসই সংস্কার প্রকল্প গ্রহণ করুক।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু সাময়িকভাবে মাটি ফেলে বা গর্ত ভরাট করে নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী টেকসই উন্নয়নকাজের মাধ্যমে সড়কটির স্থায়ী সমাধান করা হবে।
প্রায় দুই দশক ধরে কাদা, পানি, গর্ত আর ভোগান্তির সঙ্গে বসবাস করছেন স্থানীয় মানুষ। এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা—আর অপেক্ষা নয়, পশ্চিম সহশ্রাম থেকে কইতরীপাড়া পর্যন্ত সড়কটি দ্রুত সংস্কার করে স্বাভাবিক যোগাযোগব্যবস্থা ফিরিয়ে দেওয়া হোক