আবুল হাসনাত তুহিন, ফেনী: সীমান্ত সুরক্ষা, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে সরাইল রিজিয়নের ১৩টি ব্যাটালিয়নের অভিযানে জব্দ করা মাদকদ্রব্য ও অন্যান্য চোরাচালানি পণ্যের আনুমানিক মূল্য ৯৫৭ কোটি ১৩ লাখ ১৪ হাজার ৩২৮ টাকা। এ সময়ে মাদকসংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনায় ৩৩৩ জনকে আটক করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়। ব্রিফিংয়ে সরাইল রিজিয়নের গত ১০ মাসের অভিযান, সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী কার্যক্রম, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে গৃহীত নিরাপত্তাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
বিজিবি জানায়, সরাইল রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ প্রায় ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার সীমান্তে কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ ও শ্রীমঙ্গল সেক্টরের অধীন ১৩টি ব্যাটালিয়নের ২১১টি বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার
বিজিবির দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সরাইল রিজিয়নের বিভিন্ন অভিযানে ৯টি ম্যাগাজিনসহ ১১টি পিস্তল, ৭টি এয়ারগান, ৫টি পাইপগান ও ৬২ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৯ কেজি উচ্চ বিস্ফোরক, ১১৭টি ডেটোনেটর এবং ৭৭ মিটার ডেটোনেটর তার জব্দ করা হয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানে বড় সাফল্য
মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৮১৫ পিস ইয়াবা, ১৪ হাজার ৯৬৭ কেজি গাঁজা, ৬৩ হাজার ৫৭৫ বোতল বিদেশি মদ, ১৬ হাজার ৮৮০ বোতল বিয়ার, ফেনসিডিল ও ইস্কাফ সিরাপ এবং ৪ লাখ ৩২ হাজার ৫১০ পিস বিভিন্ন ধরনের যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২১০ লিটার চোলাই মদ আটক করা হয়। এসব ঘটনায় ৩৩৩ জনকে আটক করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পাথর-বালু উত্তোলন প্রতিরোধ
সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান পরিচালনা করছে বিজিবি। এসব অভিযানে ১৬ হাজার ৮০০ ঘনফুট পাথর এবং ৮ হাজার ২০০ ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়েছে।
দুর্গত মানুষের পাশে বিজিবি
সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও অব্যাহত রেখেছে বিজিবি। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে খাদ্য, চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় জরুরি ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া সিলেট সেক্টরের উদ্যোগে সীমান্তবর্তী তরুণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং চোরাচালানবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় ৫ প্লাটুন বিজিবি
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) তাদের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ১৮টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করেছে। গত ১৬ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ উচ্চবিদ্যালয়ে একটি বেইজ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
বিজিবি জানায়, পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ এবং স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে গুজব, অপতথ্য ও সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধ এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্রিফিংয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে গুজবে কান না দেওয়া, যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করা এবং সন্দেহজনক কিছু নজরে এলে নিকটস্থ বিজিবি টহল দল, ক্যাম্প অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়।
বিজিবির বক্তব্যে বলা হয়, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নিরাপদ সীমান্ত ও সীমান্তবাসীর আস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং মানুষের কল্যাণে বিজিবির কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।