কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কেওয়ারজোড় ইউনিয়নের লাউকুড়া গ্রাম সাম্প্রতিক সহিংস সংঘর্ষের পর অস্থির ও আতঙ্কিত সময় পার করছে। পাল্টাপাল্টি মামলা, গ্রেপ্তার ভীতি এবং অনিশ্চয়তার কারণে গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় পুরো গ্রাম কার্যত পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এতে পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে এবং নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর নেমে এসেছে টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৩ মার্চ সকালে পাশের হেমন্তগঞ্জ গ্রাম থেকে বিপুলসংখ্যক লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে লাউকুড়া গ্রামের চন্ডিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় জড়ো হয়। পরে কাশেম চেয়ারম্যানের বাড়িঘর লক্ষ্য করে হামলা, ভাঙচুর ও আতঙ্ক সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় বাড়ির ভেতরে থাকা লোকজনও রক্ষা পাননি এবং আতঙ্কে অনেক পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হন। গুরুতর আহত কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সাতজন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর থেকেই গ্রেপ্তার ও মামলার আতঙ্ক পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ পুরুষ এলাকা ছেড়ে যাওয়ায় কৃষিকাজ, উপার্জন, বাজার করা, চিকিৎসা ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন নারীদের কাঁধে এসে পড়েছে। উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার খাদ্যসংকট ও আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন পার করছে। শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে এবং বৃদ্ধরা চিকিৎসাসহ নানা সেবাবঞ্চিত অবস্থায় রয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ থেকেই এ সংঘর্ষের সূত্রপাত। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার অভিযোগও রয়েছে। এদিকে হৃদরোগে এক ব্যক্তির মৃত্যুকে ঘিরে হত্যা মামলার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিয়াকত আলী জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষ মামলা করেছে এবং এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, মৃত্যুর ঘটনাটি নিশ্চিত করতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বর্তমানে লাউকুড়া গ্রামজুড়ে নীরবতা, আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।