মো: গোলাম কিবরিয়া
রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি
রাজশাহী শহরের পশ্চিম প্রান্তে রেললাইনের ধার। সন্ধ্যা নামলেই একসময় এখানে জমে উঠত এক ভিন্ন জগৎ। হেরোইন, ইয়াবা, গাঁজার খোলামেলা কেনাবেচা চলত প্রায় ১৫ ঘণ্টা ধরে — দিনের আলোতেও, রাতের আঁধারেও। রাজপাড়া থানার আইডি বাগান পাড়া ও কাশিয়াদাঙ্গা থানার গুরিপাড়া ছিল এই অন্ধকার জগতের দুটি প্রধান কেন্দ্র। পাড়ার মানুষ জানতেন, দেখতেন, কিন্তু কিছু করার বা বলার সাহস ছিল না। কারণ এই সিন্ডিকেটের পেছনে ছিল বড় বড় মদদ দাতা , আর প্রশাসনের ভেতর থেকেই একটি অসাধু চক্রের নীরব সুরক্ষা। সেই চিত্র আজ বদলে গেছে। বদলেছে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে।
শিক্ষানগরী হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত রাজশাহী। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, পলিটেকনিক — শিক্ষার্থীদের ভিড়ে মুখর এই শহরে মাদকের থাবা বিস্তার পায় ধীরে ধীরে, কিন্তু গভীরভাবে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন একটা ক্ক্রান্তিকালীন দুর্বলতায় পড়ে, তখনই সুযোগ বুঝে মাঠে নেমে পড়ে মাদক সিন্ডিকেটগুলো। আগে যা কিছুটা আড়ালে চলত, তা তখন থেকে চলতে থাকে প্রকাশ্যে।
আইডি বাগান পাড়ার রেললাইনে দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বসত মাদকের হাট। গুরিপাড়ায় দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতারা আসত নির্ভয়ে। কিশোর-তরুণরা টানা পড়ছিল এই জালে। মাদকের টাকা জোগাতে পাড়ায় পাড়ায় বেড়ে যায় চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি। কিশোর গ্যাং সংগঠিত হয় মহল্লায় মহল্লায়।
এলাকার বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, একটা সময় ছেলেমেয়েদের বাইরে পাঠাতে ভয় করত তাঁদের। বাসার কাছের মোড়ে, গলির মুখে, খেলার মাঠে — সর্বত্র ছিল এই চক্রের দৌরাত্ম্য। একজন অভিভাবক বলছিলেন, “রাত আটটার পর ছেলেকে বাইরে যেতে দিতাম না। বাড়ির পাশেই ওরা দাঁড়িয়ে থাকত।”
টেলিভিশন, পত্রিকা, অনলাইন পোর্টাল — সবখানে প্রতিবেদন হয়েছে। মাদকবিরোধী সংগঠনগুলো মানববন্ধন করেছে, স্মারকলিপি দিয়েছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই টেকসই ফল আসেনি। একসময় মনে হচ্ছিল, রাজশাহীকে মাদকমুক্ত করা বুঝি আর সম্ভব নয়।
গত ৭ মে ২০২৬। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের নতুন কমিশনার হিসেবে যোগ দিলেন, মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই কর্মকর্তা বিসিএস ২০তম ব্যাচের। দীর্ঘ কর্মজীবনে অপরাধ দমনে তাঁর প্রচুর সুনাম আছে।
চেয়ারে বসেই তিনি যা করলেন তা একটু ব্যতিক্রমী। কোনো বড় ঘোষণা নয়, কোনো প্রেস কনফারেন্সের হইচই নয় — প্রথমে ডাকলেন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের। বসলেন মুখোমুখি। শুনলেন পুরো শহরের কথা — কোথায় কোথায় মাদকের আড্ডা, কোন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দাপট, কোথায় অনলাইন জুয়ার ঘাঁটি। সব তথ্য নিলেন মনোযোগ দিয়ে।
তারপর শুরু হলো আসল কাজ। পুলিশ, ডিবি ও সিআরটি — তিনটি বাহিনী থেকে বাছাই করে গঠন করলেন একটি বিশেষ দল। এই দলকে দিলেন স্পষ্ট নির্দেশনা। লক্ষ্য একটাই — মাদক, ছিনতাই, জুয়া ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স।
বিশেষ দলটি মাঠে নামতেই বদলে যেতে শুরু করল দৃশ্যপট। প্রতিদিন একের পর এক অভিযান — আইডি বাগান পাড়া, গুরিপাড়াসহ শহরের চিহ্নিত প্রতিটি মাদক স্পটে। কোনো আগাম বার্তা নেই, কোনো ফাঁকফোকর নেই। অভিযানের পর অভিযানে গ্রেপ্তার হতে লাগল মাদক ব্যবসায়ী, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, জুয়ার বোর্ড পরিচালনাকারী এবং অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িতরা।
কমিশনার নিজে সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমে নজর রাখেন। কোনো এলাকার অপরাধের খবর প্রকাশ হলে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে আসামি গ্রেপ্তারের নজির তৈরি করেছেন তিনি। এটি এখন রাজশাহী শহরে মুখে মুখে ঘোরে।
শুধু অভিযান নয়, সমান্তরালে চালু হয়েছে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম। আরএমপির, প্রতিটি থানায় শুরু হয়েছে উঠান বৈঠক কর্মসূচি — মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে পাড়া-মহল্লায় সচেতনতা তৈরির এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে ।
অভিযানের ব্যাপকতা বোঝা যায় একটি তথ্যে — রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে এখন আসামি রাখার জায়গা সংকুলান হচ্ছে না।
কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আল মামুন জানান, বর্তমানে কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন মিলিয়ে যত আসামি রয়েছে, তাদের মধ্যে মাদক মামলার বন্দির সংখ্যা অন্য সব ধরনের আসামির চেয়ে বেশি। গত কয়েক মাসে গ্রেপ্তারের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে কারাগারে আবাসন সংকট তৈরি হয়েছে।
এই একটি তথ্যই বলে দেয়, রাজশাহীর মাটিতে কী পরিমাণ পরিবর্তন এসেছে।
আইডি বাগান পাড়ার বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, রেললাইনের পাশে যে মাদকের আসর একসময় দিনের পর রাত চলত, এখন সেই দৃশ্যের দশ ভাগের এক ভাগও আর দেখা যায় না। গুরিপাড়ায় দূর থেকে আসা ক্রেতাদের আনাগোনাও থেমেছে অনেকটা।
এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, মাদকের টাকার জন্য যে চুরি-ছিনতাই-চাঁদাবাজি চলত, তাও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। পাড়ার মোড়ে কিশোর গ্যাংয়ের আস্ফালন এখন নেই বললেই চলে। রাতে চলাফেরায় ভয় কমেছে। সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তাও আগের মতো নেই। “এখন অন্তত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি” — এটুকু বলতে পারাই এই মানুষদের কাছে অনেক বড় পাওয়া।
দীর্ঘদিন ধরে একটা প্রশ্ন ঘুরত রাজশাহীর মানুষের মনে — প্রশাসন কি সত্যিই পারে না, নাকি চায় না? কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন কাজ দিয়ে। ইচ্ছাশক্তি আর সততা থাকলে যে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব, তার উদাহরণ এখন রাজশাহী নিজেই।
নগরবাসী এই মুহূর্তে তাঁকে দেখছেন একজন বিশ্বস্ত অভিভাবকের চোখে।
মাঠপর্যায়ে যারা মাদক বিক্রি করত, তাদের অনেকে এখন কারাগারে। কিন্তু এই সিন্ডিকেটের পেছনে যে মদদদাতারা ছিলেন, যে অসাধু কর্মকর্তারা এতদিন ধরে এই অন্ধকারকে আড়াল করেছেন — তাঁদের বিষয়ে তদন্ত কতটা এগিয়েছে? শুধু ছোট বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলে মাদকের শিকড় কি সত্যিই উপড়ানো সম্ভব?
এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে আগামী দিনগুলোতে।