সোহেল খান দূর্জয়- নেত্রকোনা :
নেত্রকোনায় হাওর,পাহাড়, নদী, আদিবাসী সংস্কৃতি ও সাহিত্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নেত্রকোনা জেলা দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা। তবে পরিকল্পিত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার অভাবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। জেলার মোহনগঞ্জ, মদন ও খালিয়াজুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল বর্ষা মৌসুমে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়।মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওর, খালিয়াজুরীর হাওর ও ধনু নদীর জলপথ বর্ষায় নৌভ্রমণের জন্য বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। শীত মৌসুমে এসব হাওরে অতিথি পাখির আগমন দেশ-বিদেশের পর্যটকদের টানে। তবে নিরাপদ নৌযান, জেটি, প্রশিক্ষিত মাঝি, পর্যটক গাইড ও আবাসন সুবিধা না থাকায় হাওরভিত্তিক পর্যটন এখনো অনিয়ন্ত্রিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। খালিয়াজুরী উপজেলায় বর্ষাকালে পুরো এলাকা কার্যত পানিবন্দী হয়ে পড়ে।
নৌকানির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা, পানির মধ্যে ভাসমান গ্রাম ও ফসলি জমির দৃশ্য প্রাকৃতিক পর্যটনের বড় সম্ভাবনা তৈরি করলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় এই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। একই সঙ্গে অকাল বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে এখানকার মানুষের জীবনযাত্রাও চরম অনিশ্চয়তায় পড়ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড় নেত্রকোনার সবচেয়ে পরিচিত ও আলোচিত পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটলেও অপরিকল্পিত ভ্রমণ, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এবং অতীতে নির্বিচারে সাদা মাটি উত্তোলনের কারণে পাহাড় ধস, জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিকল্পনা না থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পট এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। উপজেলার সোমেশ্বরী নদী স্বচ্ছ পানি ও পাহাড়ঘেরা সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে নৌভ্রমণ ও প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটনের উপযোগী হলেও নদীভাঙন, পর্যটক নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর অভাবে সম্ভাবনাটি পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কলমাকান্দা উপজেলার পাতলাবন এলাকা আদিবাসী গারো জনগোষ্ঠীর বসবাস ও সংস্কৃতির কারণে ভিন্নমাত্রার পর্যটন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গারো নারীদের নেতৃত্বে পরিবার পরিচালনা, ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও সংস্কৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে।
তবে সড়ক যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ পানীয় জলের সংকটে এখানকার মানুষের জীবনমান যেমন ঝুঁকিতে, তেমনি পর্যটন বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একইভাবে উপজেলার মহাদেও নদী পাহাড়ঘেরা নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হলেও সড়ক যোগাযোগের বেহাল অবস্থার কারণে পর্যটক আগমন কমছে। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পর্যটনের ক্ষেত্রেও নেত্রকোনা পিছিয়ে নেই। কেন্দুয়া উপজেলার সাজিউড়া গ্রামে ব্রিটিশ আমলের অর্থমন্ত্রী নলিনী সরকারের পৈতৃক বাড়ি, রোয়াইলবাড়ির মোঘল আমলের স্থাপনা পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পাশাপাশি বারহাট্টা উপজেলার কাশতলা গ্রামে কবি নির্মলেন্দু গুণের পৈতৃক বাড়ি এবং কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে অমর কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর পৈতৃক ভিটা ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাহিত্য ও শিক্ষাভিত্তিক পর্যটনের বড় আকর্ষণ হতে পারত। তবে এসব স্থাপনার অধিকাংশই এখনো সংরক্ষণ, তথ্যকেন্দ্র ও পর্যটকবান্ধব সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে।
পর্যটকদের মতে, নেত্রকোনার পর্যটন বিকাশের পথে প্রধান অন্তরায় হলো সমন্বিত পর্যটন মাস্টারপ্ল্যানের অভাব, দুর্বল সড়ক ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও আবাসন সুবিধার সংকট, সরকারি–বেসরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর নজরদারির ঘাটতি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা। নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংযুক্তা পাল বলেন, সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং পর্যটক সুরক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে নেত্রকোনা হাওর ও পাহাড়কেন্দ্রিক একটি টেকসই পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
এতে জেলার অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং একই সঙ্গে ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নেত্রকোনা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. আরিফুল ইসলাম সরদার জানান, জেলার পর্যটন সম্ভাবনাময় এলাকাগুলো চিহ্নিত করে পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। এ লক্ষ্যে যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ধাপে ধাপে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পর্যটন এলাকায় আবাসন ও বিনিয়োগে এগিয়ে আসে, তবে তা জেলার অর্থনৈতিক ও পর্যটন খাতের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।