নিরঞ্জন মিত্র (নিরু) (ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধিঃ
জাগজমকপূর্ণভাবে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ফরিদপুর জেলার মধুখালীতে চৈত্র পূজার অংশ হিসেবে ঐতিহ্যবাহী ‘নীল নাচ’ ও শ্মশান কালী পুজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মথুরাপুর লাউজানা শ্মশান কমিটির আয়োজনে,(১৪ এপ্রিল) মঙ্গলবার
মধ্য রাত থেকে ভোর ৬ টা পর্যন্ত উপজেলার গাজনা ইউনিয়নের মথুরাপুর চর লাউজানা শ্মশান ঘাটে চৈত্র পূজার দেউল পূজারীরা শ্মশান কালীপুজায় অংশ নেয়।
চৈত্র পূজার অংশ হিসেবে এই দিন ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গা থেকে পূজারীরা নীল ও হাজরা পূজা শেষ করে ৭ টি দেউল পূজার দল শ্মশান ঘাটে জড়ো হয়। এদের মধ্যে অংশ নেয় গাজনা গ্রামের দীলিপ আচার্য্য দেউল, চর লাউজানা আশিষ বিশ্বাস দেউল, মহিষাপুর বিষ্ণু পদ ভৌমিক দেউল, ধোপাগাতী রাজিব মাষ্টার দেউল, চর লাউজানা বিষ্ণুপদ মন্ডল দেউল, মহিষাপুর শুশিল চন্দ্র কর দেউল ও মথুরাপুর বিশ্বেশ্বর দেউল।
এ-সময় দলগুলো যুবক ও বয়স্করা মিলে বাহারি রঙ্গে কালী- মহাদেব, দুর্গা, লক্ষী-স্বরসতী, কার্তিক, গণেশ, বাঘ, অসুর ও ঘোড়া ইত্যাদি সেজে স্বরুপে সজ্জিত হয়ে নেচে নেচে শ্মশান ঘাটে পৌঁছায়।
সেইসাথে সেখানে দলগুলো ঢাক-ঢোল আর কাসা বাদ্য বাজিয়ে শিবের চ্যালার রূপ ধারণ করে তালে তালে পা দুলিয়ে নৃত্য করে।
তাদের নৃত্য দেখে মনোমুগ্ধকর হয়ে হাজারো দর্শকের ভিড় জমায়। এ যেন সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এক মিলনমেলা অনুষ্ঠানে পরিণত হয়।
মথুরাপুর লাউজানা শ্মশান কমিটির সভাপতি রতন কুমার বিশ্বাস
এর সভাপতিত্বে, অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ৮ নং গাজনা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া।
বিশেষ অতিথি হিসেবে মধুুখালী উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক ভিপি ইকবাল, গাজনা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শিব নাথ ভৌমিক।
অন্যান্যদের মধ্যে সাবেক ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম ও সাবেক ইউপি সদস্য ওলেমান বিশ্বাস সহ বিভিন্ন পূজা মন্ডবের কমিটি বৃন্দ, পূজারিরা ও বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত হাজার হাজার সনাতন ধর্মালম্বীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বিচারক মণ্ডলীর মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক নিরঞ্জন মিত্র ও
সাংস্কৃতিক ব্যক্তি বিষ্ণু পদ চক্রবর্তী এবং অনুষ্ঠানটি সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন হারান মাষ্টার।
অনুষ্ঠান শেষে সাতটি দেউল পূজার পূজারীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।
বিষ্ণু পদ চক্রবর্তী জানায়, হিন্দুরা চৈত্র সংক্রান্তিতে উপবাস থেকে শিব ঠাকুরের আসনে ফুল, ফল, ডাবের জল ইত্যাদি উপকরণ দিয়ে অঞ্জলি দেন। শিব ঠাকুরের আরেক নাম ‘নীলকণ্ঠ’ তাই এই পূজা নীলকণ্ঠ পূজাও বলা হয়।
ধোপাগাতীর দেউল পূজার রাজিব মাষ্টার জানায়, হিন্দু নারীরা চৈত্র পূজায় উপবাস থেকে পূজায় অংশ নেয়। এছাড়া সন্ন্যাসীরা শিব ঠাকুরের দেল নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরেন। শেষ দিনে সন্ন্যাসীরা শিবের দেউল চালান দিয়ে দেউল বাড়ীতে ওঠায়। এছাড়াও এখানে আশপাশের গ্রামের বিভিন্ন দেউল পূজার পূজারীরা শ্মশান কালীপূজা দিতে আসেন।
সনাতনী ধর্মীয় মতে মূলত, নীল পূজা চৈত্র মাসের শেষ দিকে হিন্দু ধর্মীয় উৎসব হলেও আবহমান বাংলার উৎসবে তা সর্বজনীন এক উৎসবে পরিণত হয়। হিন্দু ধর্মের পৌরাণিক ধর্ম মতে, দেবতা শিব সমুদ্র মন্থনে বিষপান করে নীলকণ্ঠ ধারণ করেছিলেন। আবার বৈদিক হিন্দু ধর্ম মতে, সূর্য অস্ত গেলে চারিধার গাঢ় অন্ধকার হয়ে আসে। গাঢ় অন্ধকার নীল বর্ণের হয়। এখানে বছরের আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার প্রতীকী হলো এই নীল। কালের আবর্ত শেষ হয়ে আসে নতুন ভোর, নতুন কাল। সব সংকট কেটে পুরনো কালকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরে সুখ ও সমৃদ্ধির আশায়
হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন শিবের আরাধনা করে থাকে।