“
মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, স্টাফ রিপোর্টার ঝিনাইদহ:
১৯৯৯ সালের ১৪ অক্টোবর প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে জলিলপুর মাদ্রাসায় যোগদান করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ৩১ বছরের কর্মজীবন শেষে গত বুধবার (২২ জুলাই) ছিল তাঁর শেষ কর্মদিবস। ৬০ বছর পূর্ণ করে কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, নতুনভাবে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
নিজের বিদায়ী বার্তায় তিনি লিখেছেন, “বিদায়, হে প্রিয় ক্যাম্পাস, বিদায়।”
দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, এতদিন যে গুরুদায়িত্ব কাঁধে ছিল, তা আজ থেকে আর নেই। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ছুটির আবেদন, শিক্ষার্থীদের নানা আবদার, অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের নানা সংকট, অডিট, ভর্তি কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার ফলাফল—এসব নিয়ে প্রতিদিনের ব্যস্ততা ও দায়িত্ব আর পালন করতে হবে না।
তবে এই দায়মুক্তির মধ্যেও তাঁর কণ্ঠে ছিল গভীর আবেগ। তিনি আত্মসমালোচনার সুরে বলেন, “আমি কি সত্যিই দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি? পরিপূর্ণ কখনোই পারিনি। তবে চেষ্টা করেছি মাত্র।”
তিনি বলেন, উন্মুক্ত আকাশের নিচে শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করে ধীরে ধীরে জলিলপুর মাদ্রাসাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসার পথে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইট, বালুকণা, নিঃশ্বাস, বিশ্বাস ও প্রতিটি পরতে তাঁর পদচারণা রয়েছে। পথে অনেক বাধা-বিপত্তি, ঝড়-ঝঞ্ঝা, হিংসা ও বিদ্বেষের মোকাবিলা করতে হয়েছে। অনেক স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হলেও মানুষের সব আশা পূর্ণ হয় না—এটাই বাস্তবতা।
বিদায়ের দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা গাড়িবহর নিয়ে তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দেন। অনেক শিক্ষক আবেগে কথা বলতে পারেননি। তাঁদের চোখে পানি ছিল। অনেক শিক্ষিকা চোখ মুছছিলেন। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরাও তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছিল।
তিনি বলেন, “ভাবছিলাম, কেন এমনটি হলো? কী করেছি আমি তাদের জন্য? কেন এত মায়া, কেন এত হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা? সত্যিই আমি যদি ব্যর্থ হতাম, তাহলে কি ভালোবাসার এই প্রকাশ দেখা যেত? না, তা কখনোই না।”
তিনি আরও বলেন, “কাল থেকে আমার আর মাদ্রাসায় যাওয়া লাগবে না। আমার ছুটির ঘণ্টা বেজে গেছে।”
তবে কর্মজীবনের অবসান হলেও মানুষের কল্যাণে তাঁর কাজ থেমে থাকবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। তিনি বলেন, “যে চাকরি এতদিন করেছি, তার শেষ হলেও পুরোনো চাকরি আমি নতুনভাবে গ্রহণ করেছি। আমার এই চাকরি বহাল থাকবে আমৃত্যু।”
তিনি আরও বলেন, যতদিন তাঁর চলার শক্তি, কর্মশক্তি ও চিন্তাশক্তি বহমান থাকবে, ততদিন তিনি থামবেন না। একটি নিরাপদ বাংলাদেশের জন্য তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
নিজেকে কখনো বৃদ্ধ বা স্থবির হিসেবে দেখতে চান না জানিয়ে তিনি বলেন, বিছানায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করতে চান না; বরং শিরদাঁড়া উঁচু করে আল্লাহর পথে অবিরত চলতে চান।
এ সময় তিনি তাঁর প্রিয় নেতা শহীদ আব্দুল মালেকের কথা স্মরণ করে বলেন, কারাগারের নিরন্ধ্র অন্ধকার, সরকারি যাঁতাকলের নিষ্পেষণ কিংবা ফাঁসির মঞ্চ—কোনো কিছুই যেন তাঁকে তাঁর আদর্শের পথ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও ভীত বা বিচ্যুত করতে না পারে—এটাই তাঁর আরাধ্য কামনা।
বিদায়ী বার্তার শেষাংশে তিনি সবার কাছে ক্ষমা ও দোয়া প্রার্থনা করে বলেন, “মহান আল্লাহ যেন আমার সহায় হোন। আমিন।”