নিজস্ব প্রতিবেদক,
গত দেড় দশক ধরে ঢাকা-৫ (যাত্রাবাড়ী-ডেমরা) আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের শাসনামলের দুর্ভেদ্য এক অপরাধের দুর্গ। জমি জবরদখল, বালু ব্যবসা, লুটপাট, পরিবহন চাঁদাবাজি এবং টেন্ডারবাজির মাধ্যমে এই এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা। তবে গত ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দৃশ্যপট বদলালেও জনমনে স্বস্তি ফেরেনি। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী সিন্ডিকেটের ফেলে যাওয়া সেই অপরাধের সাম্রাজ্য এখন নিয়ন্ত্রণ করছে পরাজিত বিএনপি নেতা নবিউল্লাহ নবীর পরিবার ও নিকটাত্মীয়রা।
বিগত প্রায় ১৭ বছর ঢাকা-৫ আসনটি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করেছে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা। বিশেষ করে সাবেক সংসদ সদস্য কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, মশিউর রহমান মোল্লা সজল এবং যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ মুন্না ছিলেন এই এলাকার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।
তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় রয়েছে, ডেমরা শীতলক্ষ্যা নদী সংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল।
যাত্রাবাড়ীর পরিবহন সেক্টর এবং ফুটপাত থেকে দৈনিক লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায়। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে খুনের মতো অপরাধে সংশ্লিষ্টতা। আওয়ামী লীগের পতনের পর এলাকাটি ‘মুক্ত’ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহ-সভাপতি ও ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটে পরাজিত প্রার্থী নবিউল্লাহ নবী বর্তমানে এই অপরাধ বলয়ের একক নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন।
স্থানীয়দের মতে, নবিউল্লাহ নবী পর্দার আড়ালে থাকলেও তার প্রত্যক্ষ মদতে অপরাধের এই সাম্রাজ্য এখন পরিচালনা করছেন তার এক শক্তিশালী পারিবারিক সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটে রয়েছেন, মেয়ের জামাতা, নাতি, ভাগিনাসহ পরিবারের ঘনিষ্ঠ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন।
সরেজমিনে তদন্ত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী আমলের সেই একই কায়দায় বর্তমানে পরিবহন স্ট্যান্ড, বালু মহল এবং নির্মাণাধীন ভবন থেকে চাঁদা তোলা হচ্ছে। টেন্ডারবাজি এবং জমি সংক্রান্ত বিবাদে এখন নবীর স্বজনদের প্রভাবই শেষ কথা। ভুক্তভোগীদের মতে, কেবল ‘মুখ’ বদলেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও নির্যাতনের পদ্ধতি একই রয়ে গেছে। জাতীয়তাবাদী আদর্শের দীর্ঘদিনের কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে ঢাকা ৫ আসন।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর নবিউল্লাহ নবীর পরিবারের এমন বেপরোয়া আচরণ দলের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে সংকটে ফেলছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি, ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর যে সুশাসনের স্বপ্ন তারা দেখেছিলেন, তা এই পারিবারিক সিন্ডিকেটের কারণে ধূলিসাৎ হতে চলেছে। প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই অপরাধের জাল ছেঁড়া অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।