খ ম জায়েদ হোসেন, নাসিরনগর
(ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধিঃ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেরা নাসিরনগর উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন চাতলপাড়। হাওরবেষ্টিত এই প্রত্যন্ত জনপদে উচ্চশিক্ষার একমাত্র ভরসা চাতলপাড় ডিগ্রি কলেজ। এই কলেজের ডিগ্রি শাখার (পাস কোর্স) ১০ জন শিক্ষক ১৫ বছর ধরে বিনা বেতনে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় একাডেমিক অনুমোদন থাকলেও দীর্ঘদিন শিক্ষকরা এমপিওভুক্ত না হওয়ায় কলেজের ডিগ্রি শাখাটি বন্ধের ঝুঁকিতে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া নাসিরনগরে রাষ্ট্রীয় সফরে আসেন। তখন স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে হাওরের জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে চাতলপাড়ে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে নগদ অর্থ অনুদানে কলেজটির ভিত্তি গড়ে উঠে । স্থানীয়দের দান করা প্রায় তিন একর জমির ওপর গড়ে ওঠে কলেজটি।
নাসিরনগর উপজেলা সদর থেকে কলেজটির দূরত্ব ২২ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১৪ কিলোমিটার নৌপথ, বাকি অংশ কাঁচা সড়ক। বর্ষা মৌসুমে যাতায়াতে সময় লাগে ২-৩ ঘণ্টা। ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী আছে প্রায় সাড়ে পাঁচশ। এর মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিকে ৩৫০ জন ও ডিগ্রি পাস কোর্সে ২০০ জন। বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি মিলিয়ে চাতলপাড় কলেজে মোট ২৭ জন শিক্ষক কর্মরত। এর মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক শাখায় ১৭ জন ও ডিগ্রি শাখায় রয়েছেন ১০ জন শিক্ষক। ডিগ্রি শাখার শিক্ষকরা দীর্ঘদিনেও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ডিগ্রি শাখার শিক্ষক আলফাজ উদ্দিন আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘যখন কলেজে যোগদান করি তখন সরকারি চাকরিতে আবেদন করার বয়স ছিল। এখন সে বয়স চলে গেছে। বিয়ে করেছি; সংসার হয়েছে। টানা ১৫ বছর বিনা বেতনে শিক্ষকতা করে পরিবার নিয়ে চলতে পারছি না।’
আরেক শিক্ষক আব্দুল করিম বলেন, তিনি ১৫ বছর আগে নেত্রকোনা থেকে এই কলেজে যোগদান করেন। কলেজটির প্রতি মায়া হয়ে গেছে তাঁর। তাই আর্থিক কষ্ট থাকার পরও কলেজ ছাড়তে পারছেন না। ডিগ্রি শাখার শিক্ষকরা কলেজ ছেড়ে দিলে অনেক শিক্ষার্থীই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে না। তাই কষ্ট হলেও শিক্ষকতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
চাতলপাড় ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী হেনা আক্তার বলেন, ‘এইচএসসি পাস করার পর চাতলপাড় ডিগ্রি কলেজে পাস কোর্সে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু কলেজের নানা সংকটের কারণে পড়া শেষ করাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
চাতলপাড়ের বাসিন্দা ইকরাম আলী বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের শহরে পাঠানোর সামর্থ্য নেই। এই কলেজই ভরসা। এটা বন্ধ হয়ে গেলে তারা আর পড়তে পারবে না।’
চাতলপাড় কলেজের অধ্যক্ষ মো. ওমর আলী জানান, ডিগ্রি শাখার শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির জন্য ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনবার আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি।
শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দিয়েছেন জানিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ নাসিরনগর আসনের সংসদ সদস্য এমএ হান্নান এমপি বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফল অর্জন করে আসছে এ কলেজ। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও বিএ ও বিএসএস (পাস) কোর্স এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বেতন-
ভাতা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে ডিগ্রি শাখার কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
এবং বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার ফলে হাওর ও ভাটি অঞ্চলের শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।