সোহেল খান দূর্জয়- নেত্রকোনা :
নেত্রকোণার মদন উপজেলায় সরকারি চাল কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুই খাদ্য কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।এখন প্রশ্ন হলো, অপরাধ করলে বদলি এটাই কি শাস্তি, না তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া। সরকারি চাল পাচার চেষ্টার ঘটনায় প্রশাসনের হাতে প্রায় ২০ টন চাল জব্দ হওয়ার পর তদন্তে খাদ্য গুদামে অতিরিক্ত আরও প্রায় ৪৪ টন চালের সন্ধান মেলে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে মদন খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম এবং উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা দুলাল মিয়াকে বদলি করা হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মু. জসীম উদ্দিন খান বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার জারি করা এক আদেশে মাহমুদুল আলমকে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় বদলি করা হয়। পরদিন বুধবার পৃথক আরেক আদেশে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা দুলাল মিয়াকে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় স্থানান্তর করা হয়,গরীবের হক মেরে এটাই কি তাদের শাস্তি। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—ঘটনার তদন্তে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোয়েতাছেমুর রহমানের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত মিললেও কেন তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? তিনি কোন অদৃশ্য শক্তিতে এখনো আছেন।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন গুদাম পরিদর্শন না করা এবং তদারকিতে গাফিলতির সুযোগে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সরকারি চাল নিয়ে অনিয়মের সুযোগ পেয়েছে। অনেকের ভাষ্য, “বদলি কোনো শাস্তি নয়, বরং দায় এড়ানোর কৌশল। গত বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১০টার দিকে মদন উপজেলার নেত্রকোনা-মদন সড়কের সাম্য ফিলিং স্টেশনের সামনে অভিযান চালিয়ে ৬৬৭ বস্তা সরকারি চালভর্তি একটি ট্রাক জব্দ করে প্রশাসন। জব্দ করা চালের পরিমাণ প্রায় ২০ মেট্রিক টন। এ সময় ট্রাকের চালক শামীম মিয়া ও হেলপার শাহীন মিয়াকে আটক করা হয়। পরদিন শুক্রবার সকালে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা দুলাল মিয়া বাদী হয়ে মদন থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় স্থানীয় ব্যবসায়ী এনামুল হক আনারসহ অজ্ঞাত আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়। ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে খাদ্য বিভাগ। গত শনিবার খাদ্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সেলিমুল আজম সরেজমিন তদন্তে যান। তদন্তে গুদামে অতিরিক্ত আরও ৪৩ দশমিক ৫৬০ মেট্রিক টন চালের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। পরে পুরো গুদাম সিলগালা করা হয়।
জেলা কর্মকর্তাও দায় এড়াতে পারেন না”তদন্ত শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অতিরিক্ত পরিচালক মো. সেলিমুল আজম বলেন,
“ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এসব চাল গুদামে রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে গুদাম কর্মকর্তা ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। পাশাপাশি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তারও যোগাযোগ থাকতে পারে। তিনি দায় এড়াতে পারেন না।”তিনি আরও বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে অন্তত একবার গুদাম পরিদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও মদন খাদ্য গুদাম গত প্রায় দুই বছরেও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের পরিদর্শনের আওতায় আসেনি। ফলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মু. জসীম উদ্দিন খান বলেন,“এ ধরনের কাজ শুধুমাত্র গুদাম কর্মকর্তার একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দায়ী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠান কখনো নেবে না।”অন্যদিকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোয়েতাছেমুর রহমান বলেন,“দুই কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে। বিভাগীয় মামলাও হতে পারে।” নানা অভিযোগ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোয়েতাছেমুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মাসোহারা নেওয়া, ধান-চাল সংগ্রহে কমিশন বাণিজ্য, নীতিমালা ভেঙে দীর্ঘ সময় একই পদে দায়িত্ব পালন এবং নামে-বেনামে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে।সূত্রগুলোর দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পের চাল কিনে গুদামে মজুত রেখে অন্য গুদামে সংগ্রহ দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। মদনের সাম্প্রতিক ঘটনায় সেই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম নতুন করে সামনে এসেছে।