ষ্ট্যাফ রিপোর্টার,
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে ২০১৪ সাল থেকে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে ‘কটিয়াদী শাহীন বৃত্তি ও ক্যাডেট একাডেমি’। দীর্ঘ এক যুগের পথচলায় শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল, বৃত্তি অর্জন এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এলাকায় একটি অবস্থান তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা।
তবে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগ ও সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব অভিযোগের পেছনে একটি মহলের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুণ্ন করতেই পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
শিক্ষার্থী ৬২৩, শিক্ষক ৩১
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৬২৩ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন ৩১ জন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি পরীক্ষার প্রস্তুতি, শৃঙ্খলা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমেও গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে জানান শিক্ষকরা।
এছাড়া ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি পাঠদানের অনুমতি পেয়েছে বলে জানা গেছে। কর্তৃপক্ষের মতে, এটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের শিক্ষা কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
সরকারি বৃত্তিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য
২০২৬ সালের পঞ্চম শ্রেণির সরকারি বৃত্তি পরীক্ষায় শাহীন ক্যাডেট একাডেমি থেকে ৯ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ৬ জন বৃত্তি অর্জন করেছে। এর মধ্যে ৪ জন ট্যালেন্টপুল এবং ২ জন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে বলে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ জনের বৃত্তি অর্জনের বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক শিক্ষাগত সাফল্যের অন্যতম দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরছেন শিক্ষকরা।
শিক্ষার্থীদের মুখেও ইতিবাচক বক্তব্য
সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলা হয়। তারা জানায়, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন এবং পড়াশোনার বিষয়ে সহযোগিতা করেন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মীর মুর্শেদ ও প্রধান শিক্ষিকা ইমরানা আহমেদ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেন বলেও কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম চলছে এবং অনেক শিক্ষার্থী এখান থেকে পড়াশোনা করে বিভিন্ন পর্যায়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনের তদন্ত
সম্প্রতি এক অভিভাবক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এনে কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে ১৭টি অনিয়মের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করবে বলে জানিয়েছে। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও প্রধান শিক্ষিকা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা।
‘সাফল্য দেখে একটি মহল ঈর্ষান্বিত’
পরিচালক মীর মুর্শেদ বলেন, “২০১৪ সাল থেকে আমরা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছি। বর্তমানে আমাদের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬২৩ জন। সরকারি বৃত্তি পরীক্ষায়ও আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো করেছে। এসব সাফল্য একটি মহলের কাছে হয়তো সহনীয় হচ্ছে না। তাই প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নানা ধরনের তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে প্রশাসন তদন্ত করুক। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে আমরা অবশ্যই জবাব দেব। কিন্তু তদন্তের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানকে দোষী বানিয়ে দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।”
প্রধান শিক্ষিকা ইমরানা আহমেদ বলেন, “শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা হোক। আমরা তদন্তকে স্বাগত জানাই। তবে যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করা উচিত নয়।”
‘অভিযোগের পাশাপাশি সাফল্যও বিবেচনায় আসুক’
স্থানীয়দের মতে, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের ফলাফল ও স্থানীয় পর্যায়ে এর ভূমিকার বিষয়টিও তদন্তের সময় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শাহীন ক্যাডেট একাডেমির শিক্ষকরা বলছেন, তারা কোনো ধরনের বিতর্কে যেতে চান না। প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রকাশ পেলেই সব ধরনের বিভ্রান্তির অবসান হবে।
তাদের বক্তব্য, একটি প্রতিষ্ঠানের ১২ বছরের শিক্ষা কার্যক্রম ও শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার নয়, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা হওয়াই সবচেয়ে জরুরি।