ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাটঃ
সুন্দরবনে দীর্ঘদিন ধরে ত্রাস সৃষ্টি করা কুখ্যাত ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ ২৭ জন বনদস্যু অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। আত্মসমর্পণের সময় তারা বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেন।
সোমবার বিকেল পাঁচটার দিকে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবনের চরপুটিয়া খালসংলগ্ন এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ ২৭ জন সক্রিয় সদস্য কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। মঙ্গলবার সকাল ১১টায় কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের সদর দপ্তর মোংলায় আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম এ তথ্য জানান।
কোস্ট গার্ড জানায়, সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং বনদস্যুদের নির্মূল করতে বর্তমান সরকারের নির্দেশনায় তাদের নেতৃত্বে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভিযানে ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৪৫ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে। দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ৪২ জন জেলে ও বনজীবীকে জীবিত উদ্ধার করে চিকিৎসা শেষে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
টানা অভিযানের কারণে সুন্দরবনে সক্রিয় বিভিন্ন দস্যু চক্রের কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে একের পর এক বাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিচ্ছেন। এর আগে ছোট সুমন বাহিনীর সাত সদস্য এবং বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর তিন সদস্য অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবার ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখসহ ২৭ সদস্য আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন।
আত্মসমর্পণের সময় দস্যুরা কোস্ট গার্ডের কাছে তিনটি বিদেশি বন্দুক, একটি এইট শুটার, একটি ফোর শুটার, পাঁচটি দেশীয় একনলা বন্দুক, ১৫টি দেশীয় পাইপগান, দুটি চায়না পাইপগান, ৩৪০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ এবং ৫৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ জমা দেন।
আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিরা হলেন-জাহাঙ্গীর শেখ (৪৫), মুজাহিদ গাজী (২৭), বিল্লাল শেখ (৩৫), জাহিদ হাসান (২৮), সুমন ঢালী (৩০), এরশাদ শিকারী (৪২), ওয়াহিদুজ্জামান (৩০), আইয়ুব শেখ (৪২), রাফসান ঢালী (৩০), পারভেজ শেখ (২৭), কামরুল শেখ (২৫), জহুরুল গাজী (৩৮), সিরাজুল তরফদার (৩৮), আমিনুল ইসলাম (৪০), আসাদুল ইসলাম (৪২), বাবুল শেখ (৪৫), শাহজাহান শেখ (৪২) ও হেলাল (৩৮)। তারা খুলনা জেলার দাকোপ, কয়রা ও বটিয়াঘাটা উপজেলার বাসিন্দা।
এ ছাড়া আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে রয়েছেন বাগেরহাট জেলার রামপাল, ফকিরহাট, কচুয়া, মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলার বাসিন্দা আকরাম শেখ (৪৫), নূরুল ইজারদার (৫০), হাসান শেখ (২৭), কামরুল শেখ (২৮), জিয়া শেখ (৩৮), কবির সুলতান (৫৫), কাইয়ুম জমাদ্দার (৪০) ও শরিফুল ইসলাম বয়াতি (২১)। অপর সদস্য মো. জয়নাল আবেদীন (৩৮) পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা।
কোস্ট গার্ড জানায়, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনে ডাকাতি, জেলে ও বাওয়ালিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম, জব্দ করা অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রক্রিয়া এবং সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কোস্ট গার্ড সুন্দরবনে সক্রিয় অন্য সব বনদস্যুকেও আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। বাহিনীটি বলেছে, যারা আত্মসমর্পণ করবে, তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হবে। তবে যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আলোকে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোস্ট গার্ড আরও জানিয়েছে, সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। সরকারের নির্দেশনা ও সবার সহযোগিতায় অচিরেই সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে বাহিনীটি।